যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক। শেষ হাসিটা পুতিনই হাসবেন। ধীরে ধীরে এ কথাই স্পষ্ট হচ্ছে! অবশ্য এর পেছনে যথেষ্ঠ কারণও রয়েছে।
জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে একটু পেছনে। সময়টা ২০২০ রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা আলেক্সি নাভালিনকে উচ্চ মাত্রার বিষ প্রয়োগের ঘটনা নিয়ে হয়েছিলো ব্যাপক তোলপাড়!
নাভালিন অসুস্থ হয়ে জার্মানির একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অভিযোগের আঙুল উঠে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে।
সবাইকে চমকে দিয়ে পাঁচ মাস পরে রাশিয়ার ফিরে আসেন সুস্থ নাভালিন, তবে এয়ারপোর্টেই গ্রেফতার করা হয় তাকে।
নাভালিনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাশিয়ার অন্তত ১৮৫ টি শহর! এই বিক্ষোভে পুতিনের ছত্রছায়ায় গ্রেফতার করা হয় অন্তত ১১ হাজার লোকজনকে।
এর বাইরে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে আহত হয়েছিলো বহু লোক। অনেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা হয়েছিলো।
যদিও এই বিক্ষোভ পুতিনের জন্য বেশ অস্বস্তিকর ছিলো। তবে তার শাসনের কৌশলই ছিলো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখা।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন এই কৌশল বাস্তবায়ন করতেই পুতিন ইউক্রেনে আক্রমণ পরিচালনা করেছেন।
খোলা চোখে দেখলে এই আক্রমণের পিছনে ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদী নীতিই সামনে চলে আসে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় বিক্ষোভ দমন ও ইউক্রেনে অভিযান পরিচালনা এই দুইয়ের মধ্যে গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
ইউক্রেনে আক্রমণের মাধ্যমে পুতিন সুকৌশলে নিজের দেশের জনগণের সাথে সংঘাত এড়িয়েছেন। সেই সাথে বিরোধীদের কোনঠাসা করতেও সফল হয়েছেন।
আলেক্সি নাভালিন নিয়ে আলোচনা একেবারেই থেমে গেছে। তবে এটাও সত্য যে, ইউক্রেন আক্রমণের পিছনে এটিই একমাত্র কারণ নয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলোনস্কির রাশিয়া নীতি পরিবর্তনও অন্যতম একটি কারণ। জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভলোদিমির জেলোনস্কি ইউক্রেনের রাশিয়া নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন।
রাশিয়া পন্থী পুতিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেদভেদচুকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেন তিনি।
এছাড়া তিনি ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদান স্থগিত করতে পাশাপাশি নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপলাইন থেকে সরে আসার জন্য ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেন।
জেলেনস্কির এসব কর্মকান্ডের বিপরীতে পুতিনপন্থী ইউক্রেনের রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন পুতিন ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করে দনবাস অঞ্চলে তার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন।
সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে পুতিন ইউক্রেনে সরাসরি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
এর ফলে নাভালিনের মুক্তির দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলন থামাতে সফল হয়েছেন। একই সাথে বিরোধীদের নানা তৎপরতাকে স্তিমিত করেছেন।
পুতিন ও তার ঘনিষ্ঠজনেরা নাভালিন ও তার সমর্থককে পশ্চিমাদের চর মনে করেন। তারা এও বলেন যে, নাভালিন ইউক্রেনের মায়দান বিক্ষোভের মতো আন্দোলন গড়ে তুলে পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়।
বলা হয়ে থাকে মায়দান বিক্ষোভের জন্য সাজা দিতেই পুতিন ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ায় আক্রমণ করেছিলো। কিন্তু এই হামলা পুতিনকে নিজ দেশে অনেকটাই অজনপ্রিয় করে তুলেছিলো।
২০১৮ সালে লেভাডা সেন্টারের একটি জরিপ অনুযায়ী ৫৭ ভাগ মানুষ রাশিয়ায় সর্বাত্নক পরিবর্তন চেয়েছিলো। পরের বছরেও এই সমর্থন বেড়ে ৫৯ শতাংশে পৌঁছেছিলো।
ঐ সময়েই নাভালিন জনগণের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। বিশাল সমর্থন নিয়ে রাশিয়া জুড়ে সভা সমাবেশ শুরু করেন তিনি।
এই অবস্থা পুতিনের দীর্ঘ শাসনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুদ্ধিমান পুতিন এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন।
নিজের সকল শত্রুকে শায়েস্তা করার জন্য তিনি ইউক্রেনে সরাসরি আক্রমণ পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে একইসাথে নিজ দেশ ও প্রতিবেশী দেশের পশ্চিমা তৎপরতায় লাগাম টেনে দেয়া হয়।
বর্তমানে নাভালিন ও তার সমর্থকেরা জেলে পঁচছেন। তাদের অনেকে গৃহবন্দী আবার অনেকেই নির্বাসনে আছেন।
পুতিন বিরোধী হাজার হাজার লোক রাশিয়া ছেড়ে পালিয়েছেন। বলতে গেলে পুতিন এখন রাশিয়ার নতুন একচ্ছত্র সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
ইউক্রেনে অভিযান পুতিনের শাসনকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছে। তার বিরুদ্ধে জনগণের আস্থা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে পুতিন এই যুদ্ধে হেরে গেলেও সামনের দিনে রাশিয়াকে নির্বিঘ্নে শাসন করতে পারবেন। এমনকি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে রাশিয়ায়৷