ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে তুরস্ক ও সিরিয়ায় আঘাত আনা ভূমিকম্পের প্রভাব। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে প্রানহানির সংখ্যা। ইতিমধ্যেই দেশ দুটিতে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৮ হাজার।
আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত আরো ৩০ হাজার মানুষকে। অধিকাংশই হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রনায় ছটফট করছেন। এখনো অসংখ্য মানুষ রয়েছেন নিখোজ অবস্থায়।
বেচে ফেরা স্বজনদের কান্নার আওয়াজে ভারি হয়ে উঠেছে সিরিয়া ও তুরস্কের আকাশ বাতাস। উদ্ধারকারীরা নিজের জীবন বাজি রেখে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রেস্কিউ টিমের সাথে যোগ দিয়েছে স্থানীয় জনগন। তবুও যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় উদ্ধারকর্মী ও সরঞ্জামের পরিমান খুবই কম।
দুই দিন পাড় হয়ে যাওয়ার পর, এখনো ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে শিশুর গগনবিদারী চিৎকার। দেয়ালের নিচে আটকে পড়া ব্যাক্তিরা সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছেন, আরেকটু বেশি সময় বেচে থাকার।
ভেঙে পড়া ভবনের ভিতরেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন এক নারী। নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করেছেন রেস্কিউ টিমের সদস্যরা। তবে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বাচানো সম্ভব হয়নি শিশুটির মা'কে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতককে হাতে নিয়ে দৌড়ে আসছেন এক উদ্ধারকর্মী। সেই সময় আরেক উদ্ধারকর্মীকে কাপড় এগিয়ে দিতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া তথ্য অনুযায়ী, সদ্যোজাত শিশুটির মা কিংবা পরিবারের অন্য কেউ বেঁচে নেই। তার বর্তমান অবস্থা জানা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
এছাড়াও অসংখ্য শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে। এর মধ্যে একটি শিশুকে প্রায় ২০ ঘণ্টা আটকা পড়ে থাকার পর উদ্ধার করা হয়। আরেকজনকে জীবিত বের করে আনা হয়েছে ৩৩ ঘন্টা পর।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে সাত বছরের এক বোনের ভিডিও। বিপদের মুহুর্তেও পরম মমতা দিয়ে ভাইকে আগলে রেখেছে সে। নিজের একটা হাত দিয়ে চেষ্টা করে চলেছে, ভেঙে পড়া ছাদকে কোন রকমে ঠেকিয়ে রাখার।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষ সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছেন টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ও ফেসবুকে। জরুরি সেবা নম্বরে এত বেশি সাহায্যের আবেদন আসছে যে, পুরো ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিমুহূর্তে এরকম আরো শত শত মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে পুরো বিশ্ব। যা কাপিয়ে দিয়েছে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত সবার মন।
বিশ্ব নেতারাও যুদ্ধ ভুলে এক হয়ে, ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত সিরিয়া ও তুরস্কের পাশে দাড়িয়েছেন। রাশিয়া ইউক্রেন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও, শুরু থেকেই উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে ৩০০ রুশ সেনা সদস্য।
এছাড়াও সোমবারের ভূমিকম্পে উদ্ধারকর্মী ও সরঞ্জামসহ, তুরস্ক ও সিরিয়ায় চারটি বিমান পাঠিয়েছে রাশিয়া। প্রতি টিমে ১০০ উদ্ধারকর্মী ও ৪০ জন চিকিৎসক আছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় পাঠানো হয়েছে দক্ষ রেস্কিউ টিম। জরুরি মুহুর্তে পথ খুজে বের করতে সক্রিয় করা হয়েছে কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট সিস্টেম।
এছাড়াও ই ইউ ভুক্ত আরো অন্তত ১৩টি দেশ সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। যে কোন মুহুর্তে তুরস্ক এবং সিরিয়ার পাশে দাড়াতে প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছে তারা।
দুর্যোগের দিনে সকল ভেদাভেদ ভুলে তুরস্কের পাশে দাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, ইমারজেন্সি মেডিকেল টিম এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর সহ, ৭৯ সদস্যের একটি স্পেশাল রেস্কিউ টিম পাঠিয়েছে তারা।
একইভাবে এরদোয়ানের সাহায্যের ডাকে সাড়া দিয়েছে সামরিক জোট ন্যাটো। এরইমধ্যে সদস্য দেশের অনেকে সাহায্য নিয়ে পৌছে গেছে বিপর্যস্ত এলাকায়। আরো বেশ কিছু রাষ্ট্র প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া অন্যান্য পরাশক্তির মধ্যে আছে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি,স্পেন, চীন, ইরান সহ আরো বেশ কিছু দেশ।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনায় উদ্ধারকাজে যোগ দিতে, বাংলাদেশ থেকেও একটি উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। ১২ জনের সেই দলে আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্য।
সাধারণ মানুষও যে যেভাবে পারছেন, নিজের অবস্থান থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্ম, সীমানা ও রাজনীতি ছাড়িয়ে এখন সবার একটাই প্রার্থনা, দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠুক তুরস্ক এবং সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি।