যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এমনিতেই নানা বিষয়ে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
তাইওয়ান ইস্যু, এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে লড়াই সহ, নানা বিষয়ে বিবাদে জড়িয়েছে দেশ দুটি। তার উপর সাম্প্রতিক বেলুন কান্ড নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই কান্ড ঘিরে চারিদিকে হইচই পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বেলুন ঢুকে পড়ার কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
চীনের দাবি এই বেলুন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য উড়ানো হয়েছিল। ভুল করে বাতাসে ভেসে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় চলে গেছে।
তবে চীনের দাবির সত্যতা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, একই বেলুন লাতিন আমেরিকার আকাশে উড়তে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এফ-২২ যুদ্ধবিমান দিয়ে গুলি করে বেলুনটিকে ধবংস করেছে। বেলুন কান্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিংকেন চীন সফর বাতিল করেছেন।
অথচ বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার চীন সফর। অনেক দিন থেকে দুই দেশের মধ্যে নানা অমীমাংসিত ইস্যুতে বিরাট ফাটল তৈরি হয়েছে।
আশা ছিল ব্লিংকেনের সফর সেটির মেরামতে সহায়ক হবে। বেলুন কান্ডের পর সেই ফাটল আরো বেড়ে যাবে, এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক।
রহস্যজনক বেলুন কান্ডের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা নানা রকম মতামত দিচ্ছেন।
কার্নেজ কাউন্সিল ফর এথিকস, ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক আর্থার হল্যান্ড মাইকেলের মতে, 'চীন ইচ্ছে করেই এই বেলুন পাঠিয়েছে।
এর মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে চায় তাদের কাছে এমন সব প্রযুক্তি আছে, যা বড় ধরণের উত্তেজনা তৈরি না করেই, অনায়াসে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা লঙ্ঘন করতে পারে।'
অন্য একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রণীত নীতির পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন এই কাজ করেছে।
এর মাধ্যমে চীন এটাই বোঝাতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও তাদের প্রযুক্তি নজরদারি চালাতে সক্ষম।
অনেক দিন ধরেই দুই দেশ নানা ইস্যুতে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করছে। তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের পর, চীন বেশ জোরালোভাবেই প্রতিবাদ করেছিলো।
গত বছর ন্যান্সি পোলেসির সফরের পর তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা চরম মাত্রা পেয়েছিলো।
ঐ সময় চীন সামরিক মহড়া চালালে, তাইওয়ানের নিকট যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর মোতায়েন করেছিলো।
ইন্দো প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তা বাড়ানোকেও চীন হুমকির চোখেই দেখে আসছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সাথে নতুন একটি সামরিক চুক্তি সই করেছে।
এই চুক্তির ফলে ফিলিপাইনের চারটি সামরিক ঘাটি ব্যবহার করে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের উপর নির্বিঘ্নে নজরদারি চালাতে পারবে।
উত্তরে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এবং দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়া, তিনটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এর মাঝখানে ফিলিপাইনের সাথে সামরিক চুক্তি চীন বিরোধী বলয়কে বিশাল শক্তিশালী করেছে।
এসব নানা কারণ বিশ্লেষণ করে অনেক গবেষক মতামত দিয়েছেন যে, ২০২৫ সালে দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বেলুন কান্ড দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নকে পিছনে ঠেলে দিলো।
অন্যদিকে, চীনের বেলুন কান্ডের পর নিরাপত্তা ও কৌশলগত আলোচনায় নতুন করে বেলুনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্পাই ডিভাইস হিসেবে বেলুনের ব্যবহারের ইতিহাস বহু পুরানো। ২য় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে নজরদারি ও বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাতে বেলুনের ব্যবহার হয়েছিলো।
মনে করা হচ্ছে নতুন করে বেলুনের ব্যবহার ফিরে আসছে। এমন ধারণার পিছনে পেন্টাগনের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা জোরালো সমর্থন দিচ্ছে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পেন্টাগনের নেটওয়ার্কে বেলুন যুক্ত করার কথা বিবেচনা করছে। কারণ এই ধরনের বেলুন বর্তমান সময়ের স্যাটেলাইট বা ড্রোনের তুলনায় বাড়তি কিছু সুবিধা দিতে সক্ষম।
বেলুন ব্যবহারে খরচ কম, সহজেই যেকোনো জায়গায় মোতায়েন করা যায়। স্যাটেলাইট শুধু নিজ কক্ষপথেই ঘুরতে পারে।
অন্যদিকে বেলুনকে ইচ্ছেমতো বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো যায়। এছাড়া এটি অনেক ধীর গতিতে ওড়ে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে টার্গেটকৃত বস্তুতে নজরদারি চালানো যায়।
নজরদারি চালানোতে কে কত শক্তিশালী, তার উপর নির্ভর করেই আগামীর জয় পরাজয় নির্ধারিত হবে।
বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। এর ফলাফল আর যাই হোক, সরাসরি সংঘাতে যেন রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে৷
ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান সংকটের মাঝে, চীন যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বিশ্বে আরো অস্থিরতা বাড়বে।
এমনটাই বলছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকগণ। এজন্য বিশ্বনেতাদের হিসাব নিকাশ করেই পথ চলার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।