মধ্য এশিয়া ও ককেশাসে কমছে রাশিয়ার প্রভাব, বাড়ছে তুরস্কের আধিপত্য
হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

মধ্য এশিয়া ও ককেশাসে বাড়ছে তুরষ্কের প্রভাব। এক সময় মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চল রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ বলয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব অঞ্চলে রাশিয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে। সেখানে রাশিয়ার জায়গায় তুরস্কের প্রবেশ ঘটছে।অনেক আগে থেকেই তুরস্ক এইসব অঞ্চলে নিজের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে আসছে।রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এই কাজকে অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। রাশিয়া মন থেকে না চাইলেও, তুরস্কের চাওয়ার কাছে নতি স্বীকার করতে হচ্ছে।মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চল তুরস্কের কাছে ভূ-কৌশলগতভাবে ভীষণ গুরুত্ব পূর্ণ। তুরস্ক সোভিয়েত পরবর্তী সময় থেকেই এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো আলাদা হলে, তুরস্কই প্রথম সেগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। মধ্য এশিয়ার ৫ টি দেশ ও আজারবাইজান, এই ছয় দেশ অনেকের কাছে তুর্কি বিশ্ব নামেও পরিচিত। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল এই দেশগুলোকে এক জাতি ছয় রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও একই নীতি পোষণ করেন। তিনি এই দেশগুলোতে প্যান তুর্কিজমকে ব্যবহার করে, তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান। প্যান তুর্কিজম বলতে একই ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতিগত মেলবন্ধনে যুক্ত দেশগুলোকে বোঝায়৷ প্যান তুর্কিজম ধারণার প্রতি ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে, তুরস্ক মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে আসছে। ব্যবসা বাণিজ্য, সামরিক ও অবকাঠামোগত খাতেও ব্যাপক অবদান রাখছে। সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারে তুরস্ক এই অঞ্চলে রাশিয়াকে প্রায় পিছনে ফেলছে। এরদোয়ান দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি, জ্বালানি সম্পদের সুবিধাকে কাজে লাগাতেও কৌশল রচনা করেছেন। এর আগে আর্মেনিয়া আজারবাইজান যুদ্ধে মধ্যস্থতা করে তুরস্ক আজারবাইজানে হিরো হয়েছে। দেশটি তার প্রভাব বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হয়ে উঠেছে। আবার এরদোয়ান নতুন করে তুর্কি বলয়ের বাইরের দেশ, তুর্কেমেনিস্তানকেও কাছে টানতে কাজ করছেন।দেশটি তুরস্কের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও আঞ্চলিক জ্বালানির হাব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম্পকার্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এরদোয়ান তুর্কেমেনিস্তানের গ্যাস কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে তুরস্কে নিতে চান। তুর্কেমেনিস্তানে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল মজুদ রয়েছে। মজুদের দিক থেকে রাশিয়া, ইরান ও কাতারের পরেই দেশটির অবস্থান। তুরস্ক তুর্কেমেনিস্তান থেকে গ্যাস কিনে মজুদ বাড়াতে চায়। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের আঞ্চলিক হাবে পরিণত হতে চায় তারা।তাছাড়া তুর্কেমেনিস্তানের বাইরে আজারবাইজান, ইরান ও রাশিয়া থেকে গ্যাস কিনে ইউরোপে বিক্রি করতে চায় দেশটি। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ তুরস্ককে এই সুযোগ উপহার দিয়েছে৷ নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপ লাইন দিয়ে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করতে পারছে না। আবার আন্তর্জাতিকভাবে পুতিন একঘরে হয়ে পড়ায়, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো আগের মতো রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। মস্কো নিয়ন্ত্রণাধীন কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন ও অর্থনৈতিক জোট ইউরেশীয় ইকোনমিক ইউনিয়নের প্রভাবও কমতে শুরু করেছে মধ্য এশিয়ায়৷ সম্প্রতি কাজাখাস্তান নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে, রাশিয়ার কাছ থেকে দূরে থাকার নীতি গ্রহণ করেছে। দেশটি আন্তকাস্পিয়ান যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ মিডল করিডোর তৈরির জন্য, রাশিয়াকে বাদ দিয়ে চীন ও তুরস্ককে সাথে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এভাবে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ তুরস্কের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে দিয়েছে৷ এখন দেখার বিষয় তুরস্কের এগিয়ে যাওয়ায় রাশিয়া কতটা সহযোগিতা করে। রাশিয়া কি এত সহজেই তার দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয় হারানো চেয়ে চেয়ে দেখবে? প্রশ্নের উত্তর জানতে সামনের দিনগুলোতে চোখ রাখতে হবে।


