শিশুকে দত্তক নিতে লাইন ধরেছেন সাধারণ মানুষ। সবাই চাচ্ছেন তুরস্কের ভূমিকম্পে মা ও পরিবার হারানো বাচ্চাটির দায়িত্ব নিতে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা।
গত ৬ ই ফেব্রুয়ারী তুরস্ক এবং সিরিয়ায় আঘাত হানে ভয়াবহ ভূমিকম্প। ১২ ঘন্টার কম সময় ব্যবধানে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৮ এবং ৭ দশমিক ৬ মাত্রার দু’টি ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়ে দুই দেশের অসংখ্য স্থাপনা।
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন অসংখ্য মানুষ। এর মধ্যে ছিলেন সিরিয়ার এক অন্তসত্ত্বা নারীও। অলৌকিক ভাবে সেখানেই জন্ম দেন একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানকে।
শিশুটির জন্মের পর মৃত্যুবরণ করেন নবজাতকের মা। পরবর্তীতে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় তাকে।
উদ্ধারের পর শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে সেখানে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হানি মারুফের কাছে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে সে।
ভূমিকম্পে শিশুটির বাবা এবং চার ভাই-বোন ও মারা গিয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে কেবল বেঁচে যায় সে। একারণে তার নাম রাখা হয়েছে “আয়া”। আরবি ভাষায় “আয়া” শব্দের অর্থ অলৌকিক।
চোখের পলকেই গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঘটনাটি। সাথে সাথে আয়াকে দত্তক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন হাজার হাজার মানুষ।
বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে একের পর এক ফোন কল আসতে থাকে হাসপাতালের ব্যবস্থাপকের কাছে।
অনেকে রীতিমত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট করে আয়াকে দত্তক নেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।
এর মধ্যে কুয়েতের এক টিভি উপস্থাপক জানিয়েছেন, আইনগতভাবে অনুমতি পেলে তিনি শিশুটিকে দত্তক নিতে প্রস্তুত।
আরেকজন ব্যক্তি তার পোস্টে লিখেছেন, তিনি শিশুটিকে দত্তক নিয়ে ভালভাবে বাঁচার সুযোগ দিতে যান।
তবে এখনই কারো হাতে শিশুটির দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবেনা। সম্ভবত শিশুটিকে তাঁর দাদা সালাহ আল-বাদরানের পরিবারে এনে রাখা হবে।
তাদের বাড়িও ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়েছে। সপরিবারে তাবুতে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
তবে, হাসপাতালের ব্যবস্থাপক খালিদ আতিয়াহ জানান, শিশুটির দূর-সম্পর্কের আত্মীয় ফিরে না আসা পর্যন্ত, তিনি নবজাতকের চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন।
বর্তমানে হাসপাতাল ব্যবস্থাপকের স্ত্রী শিশুটিকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন। এই দম্পতির একটি চার মাস বয়সী কন্যাসন্তান আছে।
তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং ডাক্তারদের চিকিৎসায় আগের তুলনায় আয়ার অবস্থা অনেকটা-ই স্থিতিশীল।
শিশুটিকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তার অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। আঘাত পেয়ে কালশিটে দাগ পড়েছিল দেহে। ঠান্ডা লেগে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল তার।
এতকিছুর পরেও যে শিশুটি সুস্থ ভাবে বেঁচে আছে সেটাও আরেক বিস্ময়কর ঘটনা।
শিশুটির বাড়ি সিরিয়ার উত্তরে অবস্থিত জিন্দারিস শহরে। বর্তমানে সেখানকার আকাশ বাতাস স্বজনহারা লোকেদের আর্তনাদে ভারী হয়ে আছে।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অগণিত মানুষ।
সমগ্র তুরস্ক এবং সিরিয়ার চিত্র এখন জিন্দারিসের মতো-ই। সর্বশেষ তথ্যমতে, দুইদেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়েছে।
প্রচন্ড ঠান্ডা, বৃষ্টি এবং যোগাযোগের সমস্যার কারণে উদ্ধারকাজে বাঁধা সৃষ্টি হচ্ছে। এখনো হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে আছেন কেউ কেউ। তবে, সেই সম্ভাবনা খুবই কম।
সামনের দিনগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানী, বিদ্যুৎ এবং খাবারের অভাবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি হিসেব মতে, ভূমিকম্পে তুরস্কের ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অপরদিকে সিরিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১ কোটির বেশি মানুষের।
ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত লোকেদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকেও পাঠানো হচ্ছে ত্রাণ সহায়তা।