গুম হয়ে যাচ্ছেন চীনের ধনকুবেররা। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে, আচমকাই হারিয়ে যাচ্ছেন চীনের শীর্ষ ধনীরা।
ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের অন্তত ছয়জন বিলিয়নিয়ার কিছু সময়ের জন্য পুরোপুরি নিখোঁজ ছিলেন। আর এর পেছনেও আছে অন্যরকম এক রহস্য।
ধনকুবেরদের এমন গুমের ঘটনার সবশেষ উদাহরণ বাও ফ্যান। তিনি চীনের একজন সুপরিচিত ব্যাংকার। সেইসাথে ‘চায়না রেনেসাঁ হোল্ডিং’এর প্রধান নির্বাহীর পদেও আছেন এই বিলিয়নিয়ার।
এই দুই পদের বাইরে, বাও ফ্যান চীনের প্রযুক্তি-খাতের বিনিয়োগের একজন প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী। দেশটির শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি ডিডি এবং মেইটুয়ান তার গ্রাহক।
বাও ফ্যানের নিখোঁজের বিষয়টি তার কোম্পানি “চায়না রেনেসাঁ হোল্ডিং” গত বৃহস্পতিবার সবার সামনে উন্মুক্ত করে। এরপর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারে বড় রকমের দরপতনের খবর জানা যায়।
গত শুক্রবার হংকং এর মার্কেটে চায়না রেনেসাঁর শেয়ার প্রায় অর্ধেক নেমে যায়। আর চীনের বাজারে ২৮ শতাংশ দরপতন হয় তাদের।
এই সম্পর্কে তার প্রতিষ্ঠান থেকে বিস্তারিত কিছু বলা না হলেও, ধারণা করা হচ্ছে, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার অন্তত দুই দিন আগে নিখোঁজ হন বাও।
বাও ফ্যানকে চীনের কর্পোরেট জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। তিনি এমন কিছু ব্যবসার শুরু করেন, যা চীনের অনলাইন ব্যবসার গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে।
তার নিজের ভাষ্যমতে, চীনের ৭০ শতাংশ ইন্টারনেট কোম্পানির সাথে, তার কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।
ধনী ব্যবসায়ী বাও ফ্যানের এমন গুম হবার ঘটনা, চীনের অন্যান্য বিলিয়নিয়ারদের জন্য এক প্রকার সতর্কবার্তা। এর আগেও এমন গুম হবার নজির আছে দেশটিতে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে এই একই কোম্পানির চেয়ারম্যান কংলিন নিখোঁজ হন বলে জানিয়েছে চীনের গণমাধ্যম। এই ঘটনার পর “চায়না রেনেসাঁ হোল্ডিং” কোনো প্রকার মন্তব্য না করলেও, নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে কংলিনের নাম সরিয়ে নেয়।
২০২০ সালে নিখোঁজ হয়ে যান ‘আলিবাবা’র প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের বিখ্যাত ব্যবসায়ী জ্যাক মা। প্রায় তিন মাসের জন্য খোঁজ পাওয়া যায়নি সারা বিশ্বে পরিচিত এই মুখকে।
সেবার চীনের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমালোচনা করার অল্প কদিনের মাথায় নিখোঁজ হয়েছিলেন জ্যাক মা।
তবে শুধু নিখোঁজ পর্যন্তই থামছে না এসব ঘটনা। নিখোঁজের শিকার বেশ কিছু ব্যবসায়ীকে পরবর্তীতে বড় ধরনের সমস্যার শিকারও হতে হয়েছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দূর্নীতি, কর ফাঁকি, অসাদাচারণ এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যার সাথে যুক্ত করা হয়। এর ফলে জেল খাটার নজিরও আছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চীনা-কানাডিয়ান ব্যবসায়ী জিয়াও জিয়ানহুয়া ২০১৭ সালে নিখোঁজ হন। বেশ কিছুদিন পাওয়া যায়নি তার সন্ধান। সবশেষ গতবছর দূর্নীতির অভিযোগ এনে তাকে জেলে পাঠানো হয়।
এছাড়াও ২০১৭ সালেই আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হন চীনের ইন্স্যুরেন্স জগতের বড় নাম ইউ ঝাওহুই। তার প্রতিষ্ঠান অংবানের পক্ষ থেকে আগেভাগেই জানানো হয়েছিলো, প্রতিষ্ঠান প্রধান সামনের দিনগুলোতে নিজের কাজ থেকে সরে আসছেন।
সেসময় “ব্যক্তিগত কারণ’ বলা হলেও, পরবর্তীতে সরকারি তদন্ত শেষে তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
এর আগে ২০১৫ সালে “চীনের ওয়ারেন বাফেট” খ্যাত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, গুয়ো গুয়াংচ্যাং লম্বা সময়ের জন্য নিখোঁজ ছিলেন।
একই বছর চীনের আরও কিছু শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিখোঁজ হবার ঘটনা ঘটেছিলো। যাদের বেশিরভাগই ফিরে এসে নিজেদের কাজে যোগদান করেননি।
এসব ব্যবসায়ীদের নিখোঁজ হবার পেছনে সরাসরি চীনের সরকারকে দায়ী করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্বস ম্যাগাজিন। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে সুপরিচিত এই ম্যাগাজিনের দাবি, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বিরোধিতার জেরেই সাময়িক নিখোঁজের শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।