বিশ্ব রাজনীতিতে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে বেলুন। পরপর দুটি চীনা বেলুনের দেখা মিলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে।
আবহাওয়া গবেষণার জন্য এমন বেলুন তৈরির দাবি করলেও, এ নিয়ে উত্তপ্ত বৈশ্বিক রাজনীতি।
বেলুন নিয়ে এত মাতামাতির মাঝে প্রশ্ন, এত উঁচুতে যাবার মতো বেলুন বানাতে ঠিক কি প্রয়োজন? আবহাওয়া নিয়ে গবেষণার জন্যে, বাংলাদেশ কি পারবে এমন কোন বেলুন বানাতে?
ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশে সফলতার দেখা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য কাজটি খুব বেশি কঠিন নয়। চাইলেই তৈরি করা সম্ভব চীনের মতো এমন গবেষণা বেলুন।
তবে এর জন্য দরকার বেশ কিছু সূক্ষ গাণিতিক গবেষণা। সেইসাথে বেলুন তৈরির জন্য কার্যকরী উপাদান।
চীন যে ধরণের বেলুন দিয়ে, নিজেদের আবহাওয়া সম্পর্কিত গবেষণা পরিচালনা করতে চেয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় হাই-এলটিচিউট বেলুন।
এসব বেলুন এতই উঁচুতে পৌছাতে পারে, যা কোন বিমানের পক্ষেও সম্ভব না। এ কারণেই বর্তমানে আবহাওয়া গবেষণা থেকে গুপ্তচর বা ইন্টারনেট কোম্পানি, সবাই বেলুনের গুণে মুগ্ধ।
অবশ্য ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও, এসব বেলুন তৈরি করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার ওয়েবসাইটে, এর জন্য জুড়ে দেয়া হয়েছে অনেক জটিল সব গাণিতিক সূত্র।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, গতিবিধি, গ্যাসের ঘনমাত্রা, সব মিলিয়ে এমন বেলুন তৈরি করতে দরকার অতি সূক্ষ গবেষণা।
তাত্ত্বিক হিসেবের বাইরে এসব বেলুনের নির্মাণও বেশ জটিল। বাংলাদেশ যদি হাই এলটিচিউট বেলুন নির্মাণে আগ্রহী হয়, তবে কাজটা কিছুটা কঠিন।
এসব বেলুনে অক্সিজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়। সেই সঙ্গে জরিপ কাজে ব্যবহারের যন্ত্র বা সেন্সর ও উন্নত প্রযুক্তির ক্যামেরাও দরকার।
তবে মূল সমস্যা হয় বেলুন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাই এলটিচিউট বেলুন তৈরির প্রতিষ্ঠান, ‘Raven Aerostar’ দীর্ঘ গবেষণার পর, এসব বেলুন তৈরির জন্য নিজস্ব উপাদান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যার সবগুলোর মূল উপাদান প্লাস্টিক।
বেলুন তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কিভাবে এর প্লাস্টিক জোড়া দেয়া হয় এবং আকাশের কোন স্তরে এই বেলুন ওড়ানো হবে।
আকাশের বিভিন্ন স্তরে তাপমাত্রা, বাতাসের গতি আর সম্ভাব্য সময়ে আবহাওয়ার চালচিত্র অনুযায়ী বানানো হয় একেকটি বেলুন।
এসব হিসেবের ফলে বেলুন দীর্ঘসময় পর্যন্ত বাতাসে ভেসে থাকতে সক্ষম হয়। বিষয়টা এতটাই জটিল যে, বেলুন বিশেষজ্ঞরা একে মহাকাশযান নির্মাণের সাথে তুলনা করে থাকেন।
হাই এলটিচিউট বেলুনকে দীর্ঘসময় বাতাসে ভাসিয়ে রাখাও বেশ কষ্টকর। আকাশের বিভিন্ন স্তর আর তাপমাত্রা মাথায় রেখে, বেলুনকে বারবার উপর নিচ করে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
আর এজন্য দরকার উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কম্প্রেশার। বিদ্যুৎচালিত এসব কম্প্রেশারের ক্ষমতা ৮০০ ওয়াট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এত উচ্চতায় এসব কম্প্রেশার, ক্যামেরা এবং অন্যান্য যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য, সেন্সর ব্যবহারও বেশ চ্যালেঞ্জিং।
এসব বেলুন পরিচালনার জন্য দরকার সোলার প্যানেল। দিনের বেলায় সৌরশক্তি সঞ্চয় করে ব্যাটারি চার্জ করা হয়। রাতে সেই ব্যাটারির চার্জ দ্বারা পরিচালিত হয় বেলুনের কার্যক্রম।
ভালো পরিবেশ পেলে এসব বেলুন বাতাসের সাহায্যে লম্বা পথও পাড়ি দিতে পারে। একটি সাধারাণ বেলুন তীব্র গরমে ১৬ কিলোমিটার আর শীতকালে ৮০০ কিলোমিটার পথও পাড়ি দিতে সক্ষম।
বেলুন তৈরি করতে চাওয়া দেশগুলোর জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, এসব বেলুন যেকোনো স্যাটেলাইটের তুলনায় অনেকখানি স্বস্তা। এরইমাঝে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছে বাংলাদেশ।
তাই বাস্তবতার নিরিখে গবেষণাধর্মী এমন বেলুন বানানো খুব কঠিন কিছু নয়। কেবলমাত্র উপযুক্ত পরিবেশ আর কিছুটা চর্চার মাধ্যমে, বাংলাদেশও উড়িয়ে দিতে পারে গবেষণাধর্মী হাই এলটিচিউট বেলুন।