মাতৃভূমির টানে বদলে ফেলেছেন নিজের পরিচয়। এক সময়ের স্কুলশিক্ষিকা এখন সামরিক যোদ্ধা। এক বছর আগেও জুলিয়া বনদারেঙ্কোর দিন পার হতো ছাত্রদের সাথে।
হাই স্কুলের সপ্তম গ্রেডের বাচ্চাদের পড়া দেয়া, পড়ানো আর তাদের ফলাফলের চিন্তায় সময় কাটাতেন ইউক্রেনের এই নারী।
কিন্তু রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ শুরুর পর বদলে গিয়েছে তার পরিচয়। দেশের প্রয়োজনে স্কুলশিক্ষিকা জুলিয়া এখন ব্যস্ত, সৈনিকদের দৈনিক প্রয়োজনের হিসেব নিয়ে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে, রাশিয়ান সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে আতঙ্ক শুরু হয়। তখনই যুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এই নারী।
৩০ বছর বয়েসী জুলিয়া একেবারেই অনভিজ্ঞ হলেও, নিজ দেশের টানে শুরু করেন কঠোর পরিশ্রম।
রাজধানী কিয়েভে বোমাবর্ষণ শুরু হলে, অনেকটা ঝোঁকের বশেই সৈনিকদের ব্যারাকে উপস্থিত হন জুলিয়া। তবে সেদিন জুলিয়া একা ছিলেন না।
সারা ইউক্রেন থেকে এমন বহু মানুষ উপস্থিত হতে শুরু করেন একেকটি ব্যারাকে। এসব স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা শুরু করে ইউক্রেন।
মাত্র দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ। এরপরেই একটি রাইফেল আর ১২০ টি গুলি নিয়ে, যুদ্ধে নেমে পড়তে হয় জুলিয়াকে। অল্পদিনের মাঝেই নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে নেন তিনি।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের কাছে, নিজের জীবনের বদলে যাবার গল্প বলেন জুলিয়া বনদারেঙ্কো। তার এই গল্প খুব সহজেই স্পর্শ করেছে সাধারণ মানুষকে।
কিয়েভের একটি শপিংমলে শুরু হয় জুলিয়ার সৈনিক জীবন। তার দলে ১৫০ জনের মাঝে নারী ছিলেন ৩ জন। সময়ের পালা করে দায়িত্ব বুঝে নিতে হতো তাদের। শহরের চেকপোস্ট রক্ষার বড় দায়িত্ব ছিলো এই ইউনিটের কাঁধে।
নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি জানান, শুরুর দিকে তীব্র শীতে একে অন্যকে জড়িয়ে শরীর গরম রাখতে হতো। পরে বিভিন্ন দেশ থেকে অনুদান হিসেবে জামা-কাপড়, কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ আসতে শুরু করলে, ধীরে ধীরে সামরিক ব্যারাকে পরিণত হয় দলটি।
সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে রুশ সেনারা কিয়েভ থেকে সরে যায়। এরপর জুলিয়াসহ সকলকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে। সেসময় অনেকেই সেনাদল ছেড়ে বেরিয়ে এলেও, রয়ে যান এই স্কুলশিক্ষিকা।
বর্তমানে জুলিয়া এবং তার বিগ্রেড কিয়েভের দক্ষিণে একটি গ্রামে অবস্থান করছে। তবে খুব বেশিদিন এক স্থানে থাকার সুযোগ নেই। বসন্তের শেষ নাগাদ খারকিভের মূল যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিতে হবে তাকে।
নিজের সক্ষমতা আর লাজুক স্বভাব নিয়ে চিন্তিত থাকলেও, ধীরে ধীরে সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুরু করছেন জুলিয়া। আগে সামরিক বিষয়ে আগ্রহ ছিল না মোটেই। তবে এখন সেনাবাহিনীর সাথে থাকতে স্বাছন্দ্যবোধ করছেন বলেও সাংবাদিকদের জানান তিনি।
এরমাঝে অবশ্য সেনাবাহিনী থেকে কিছুটা ছুটিও পেয়েছেন জুলিয়া। নতুন বছরের শুরুর সেই ছুটি শেষ করে, আবার যোগ দিয়েছেন ইউক্রেনের সেবায়। নিজের পরিবারের বোন, ভাগ্নে, মায়ের চেয়ে, দেশের জন্যই এখন বেশি ভাবছেন এই স্কুলশিক্ষিকা।
এতকিছুর মাঝে নিজের শিক্ষকতার কথা ভুলে যাননি তিনি। তার ব্যাগের একটা অংশে এখনো ক্লাসের বইগুলো রাখা। সময় পেলে বইগুলো নিয়ে সহযোদ্ধাদের সাথে বসে পড়েন।
মূলত সেনাদলের সাপ্লাই এবং তথ্যভিত্তিক কাজ নিয়েই, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে জুলিয়া বনদারেঙ্কোকে। এখন পর্যন্ত রাইফেল থেকে গুলি ছোঁড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলেও, প্রয়োজনের সময় ঠিকই যুদ্ধ করতে পারবেন, এমনটাই বিশ্বাস তার।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এমন একজন জুলিয়ার কথা উঠে এলেও, বাস্তবে এসব স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধার সংখ্যা অনেক বেশি।
ধারণা করা হচ্ছে, পুরো ইউক্রেনে এমন যোদ্ধার সংখ্যা আড়াই লাখ থেকে দশ লাখের কাছাকাছি হতে পারে। তাদের মাঝে আছেন অনেক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাও।