ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার এক বছর পূর্ণ হলো। পুতিনের সেই বিশেষ হামলা ব্যাপক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এই যুদ্ধ কিভাবে শেষ হবে তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
বিভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এই যুদ্ধ সহজেই শেষ হবে না। উলটো যুদ্ধের কারণে সামনের দিনে বিশ্বে আরো ভোগান্তি বাড়বে।
যুদ্ধকে ঘিরে ভূরাজনীতির জটিলতাও বাড়ছে। পুরো ইউরোপ জুড়ে বৃহত্তর একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
সম্প্রতি ন্যাটো জোটের একটি বৈঠকে বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন, জোটের সদস্য দেশের কেউ আক্রান্ত হলে, পুরো জোট আক্রান্ত হয়েছে বলে গণ্য করে তার উচিত জবাব দেয়া হবে।
এইদিকে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ২০১০ সালে সই করা নতুন কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি স্থগিত করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর শক্তিশালী সমর্থন ইউক্রেনকে শক্তি ও সাহস জোগাচ্ছে।
নিজেদের দুর্বল সামরিক শক্তি সত্ত্বেও, তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোবল পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জো বাইডেনের ইউক্রেন সফর, সেই মনোবলকে আরো চাঙা করেছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মনে করা হয়েছিল, পশ্চিমাদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, যুদ্ধে রাশিয়াকে নমনীয় হতে বাধ্য করবে।
এক বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমাদের এতসব প্রচেষ্টার পরও রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি খুব বেশি দুর্বল হয়নি।
এর বিপরীতে রাশিয়া তার সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত, বৈশ্বিক অর্ডারকেই বদলে দেয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। রাশিয়ার পাশে চীনের মৌন সমর্থন পুতিনকে শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে।
চীনের সহায়তায় রাশিয়া BRICS জোটকে অধিক সক্রিয় করতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই জোটের সক্রিয়তা বাড়িয়ে, ডলার কেন্দ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটা বড়সড় ধাক্কা দিতে চায় পুতিন।
এই কাজে ভারতকেও পাশে পাওয়া রাশিয়ার কাজকে সহজতর করে তুলছে। ব্রিকস জোটে সৌদি আরব যুক্ত হওয়ার যে গুঞ্জন উঠেছে তা সত্যি হলে, পশ্চিমা জোট ভালোই বিপদে পড়বে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে বৈশ্বিক মেরুকরণ দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে। যুদ্ধের শুরুতে পুতিন ধারণা করেছিলো, জ্বালানিকে পুঁজি করে ইউরোপের দেশগুলোকে নিজের পক্ষে টানবেন, ইউক্রেনকে যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য করবেন।
পুতিনের এই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। গত এক বছরে ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার প্রতি জ্বালানি নির্ভরতা, ৪০ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এটিকে বাইডেন তার বিশাল এক জয় হিসেবেই দেখছেন।
অন্যদিকে যে ন্যাটোর সম্প্রসারণের কথা তুলে পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করলেন, সেই ন্যাটোই ইউরোপের অন্য দেশে প্রসারিত হচ্ছে।
পুর্ব ইউরোপ ছেড়ে এবার ন্যাটো উত্তরের দেশ সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে ঘাটি ঘাড়ছে।
সব মিলিয়ে পুতিন বেশ চাপেই আছেন। বছরব্যাপী চলমান এই যুদ্ধে রাশিয়ার হতাহতের সংখ্যাও কম নয়।
প্রথমদিকে এই সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া না গেলেও, রাশিয়ার বাহিনীর পিছু হটা দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে।
সামরিক শক্তির দিকেও রাশিয়া কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরান ও উত্তর কোরিয়া থেকে অস্ত্র আমদানি সেটির প্রমাণ দিচ্ছে। চীনের কাছ থেকেও অস্ত্র পেতে চাইছে তারা।
চীন যেন রাশিয়াকে অস্ত্র না দেয়, এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রতি জোরালো আহবান জানিয়েছে।
কিছুদিন আগে চীনের শীর্ষ কূটনীতিকরা মস্কো সফর করেছেন। এই সফর ঘিরেও নানা রহস্য জমাট বেধে উঠছে।
এতসব রহস্যের ঘনঘটা ও দুই পক্ষের নানারকম প্রচেষ্টা দেখে, এটাই প্রতীয়মান হয় যে কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিতে নারাজ।
এমন মানসিকতা থাকলে আর যাই হোক, যুদ্ধের সমাধান সহজ হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।