রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ফল ভোগ করছে গোটা বিশ্ব। এই যুদ্ধ শুধু দুই দেশের সীমাবদ্ধ নেই। এই লড়াইয়ের কারণে বিশ্বব্যাপী সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এর কারণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ধনী দেশগুলোর সংগঠন OECD-এর একটি পরিসংখ্যান বলছে, এই যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। হিসাবে শুধু উৎপাদন ক্ষতি উঠে এসেছে।
এর বাইরে অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করলে, হিসাবের খাতা আরো লম্বা হবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশেষজ্ঞরা এসবের বাইরে যে সংকটটিকে সবচেয়ে বড় হিসেবে বিবেচনা করছেন, সেটি হলো মূল্যস্ফীতি।
মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে, দেশে দেশে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদ নীতিহার বাড়িয়ে চলছে।
এই কারণে স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে সংকট বাড়ছে, দেশগুলোতে ডলারের দাম বাড়ছে। দাম বাড়ায় স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে।
এর ফলে দেশগুলোকে পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানি রপ্তানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায়, বিশ্বের মানুষ সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে।
সংস্থাটি সম্প্রতি ১১৬ টি দেশের ওপর একটি সমীক্ষা করেছে। সেই হিসাবে দেখা গেছে, এই এক বছরে দেশগুলোর, পরিবার প্রতি জ্বালানি খরচ ৬৩ থেকে ১১৩ শতাংশ বেড়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ায়, বিশ্বের ৭ কোটি ৮০ লাখ থেকে ১৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি অন্য সব কিছুতেই প্রভাব ফেলেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এসব ব্যয় মেটানো মুশকিল হয়ে পড়ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। কোভিড পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা সংকটে পড়লেও, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো পর্যায়ে রেখেছিলো।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে ডলারের অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে ২০ শতাংশের বেশি৷
রপ্তানি বাড়ায় রিজার্ভের পরিমাণ কমে গেছে। কাঁচামাল আমদানি ও জ্বালানির দাম বাড়ায়, দেশীয় উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ৫ টি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
প্রথমত, গম আমদানিতে বাংলাদেশ রাশিয়ার উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় দেশে গমের দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশ মোট গম আমদানির ৮০ ভাগ রাশিয়া থেকে আমদানি করে। যুদ্ধের কারণে এই আমদানি ব্যাহত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত - বাংলাদেশ ভোজ্য তেলের দাম বর্তমানে লাগামছাড়া। এর পিছনেও রয়েছে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ।
বাংলাদেশ মূলত পাম অয়েল ও সয়াবিন অয়েল থেকেই ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটায়। এসবের মূল যোগান রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকেই আসতো।
যুদ্ধের কারণে এই সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ায় ঝামেলা বেড়েছে।
তৃতীয়ত- পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল ভূট্টার মূল যোগান আসতো ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে।
বাংলাদেশ মোট পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনের ৬০ ভাগ কাঁচামাল আমদানি করে। আমদানি ব্যাহত হওয়ার উৎপাদন কমেছে। এর প্রভাবে মুরগি, ডিম ও মাংসের দাম বেড়েছে।
তেও খরচ বেড়েছে। বাংলাদেশ রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে সিংহভাগ সার আমদানি করে।
রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় এটি বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করেছে।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে উলটপালট করে দিয়েছে। নিজ প্রয়োজনে রাশিয়া কিছু দেশের কাছে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করেছে।
ওপেক প্লাসকে প্রভাবিত করে, ব্যারেল প্রতি জ্বালানির দাম বাড়াতেও প্রণোদনা জুগিয়েছে তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল প্রধান দেশগুলোর জ্বালানি দাম বাড়িয়ে দেয়া, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারনে, বাংলাদেশকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
আশার কথা হলো, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কাটাতে বিশ্বব্যাপী কাজ শুরু হয়েছে।
নতুন কোন পথ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে অচিরেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা দূর হবে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।