আফ্রিকাকে লুটে খাচ্ছে রাশিয়ার ভাড়াটে বাহিনী। আলোচিত এই বাহিনীর নাম ওয়াগনার গ্রুপ। অনেক দিন থেকেই আফ্রিকা মহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে আছে তারা।
আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যার সুযোগ নিয়ে শক্তিশালী দেশে গুলো এখানে কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
ওয়াগনার গ্রুপ নামের বিশেষ এই ভাড়াটে বাহিনী তৈরি করেছেন, অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল দিমিত্রি উটকিন। তবে সার্বিক সহযোগিতায় ছিল রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়ার আগ্রাসনের সময় প্রথম ওয়াগনার গ্রুপের নাম পরিচিতি পায়। তারা প্রভাব খাটিয়ে, আফ্রিকার দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদে দখলদারিত্ব কায়েম করেছে। এর মাধ্যমে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। ঝিমিয়ে পড়া রাশিয়ান অর্থনীতিকে সবল রাখতে, ওয়াগনার গ্রুপ বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।
আর এই কারণেই পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে খুব একটা কাবু করতে পারছে না। সরকার বিরোধী আন্দোলন, সংঘাতময় পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভাড়াটে বাহিনীই প্রধান ভূমিকা পালন করে। নতুন কোনো নেতাকে ক্ষমতায় বসাতেও ভাড়াটে বাহিনী পেছন থেকে কাজ করে। আর এইসব ভাড়াটে বাহিনীর দখলে ব্যাপক পরিমাণে অস্ত্রের মজুদ রয়েছে।
অস্ত্রের মালিকানার ভিত্তিতেই এক সময় ভাড়াটে বাহিনীতে সদস্য রিক্রুট করা হতো। বর্তমানে এই বাহিনী নিজেদের ঢেলে সাজিয়েছে। অনেক দেশে এই বাহিনী এখন কূটনীতির প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। শীতল যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়া আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই কাজ অবিরাম গতিতে চলছে।
সাময়িক কিছু সময়ের জন্য অবস্থান দুর্বল হলেও, বর্তমানে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। আর ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপ রাশিয়ার এই অবস্থান তৈরিতে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে।আফ্রিকার দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে, গ্রুপটি নিজের স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে। গ্রুপটি আফ্রিকার প্রভাবশালী নেতাদের সুরক্ষা দেয়। বড় বড় প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বেও জড়িয়ে আছে এই গ্রুপের ভাড়াটে সেনারা।
রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলাতেও তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বেসামরিক মানুষের ক্ষতি করে হলেও, তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে থাকে। কৌশলী নেতৃত্ব ওয়াগনার গ্রুপকে একের পর এক সাফল্য এনে দিয়েছে৷ এই কারণে গ্রুপটি আফ্রিকার রাজনৈতিক নেতাদের বিশস্ততা অর্জন করেছে।
এই অর্জনকে ব্যবহার করে গ্রুপটি রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পূরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ২০১৭ সালে ওয়াগনার গ্রুপ সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিলো।এর বিনিময়ে রাশিয়ার ব্যবসায়ীরা নাম মাত্র মূল্যে হীরার খনির দখল নিয়ে নেয়।
আফ্রিকার আরেক দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকেও ওয়াগনার গ্রুপের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।২০১৭ সালে বিদ্রোহী বাহিনীকে দমন করতে, দেশটির সরকারকে সহায়তা করেছিলো ওয়াগনার গ্রুপ। এর পর থেকে দেশটির নীতি নির্ধারণে মূল শক্তি হয়ে উঠে রাশিয়া।
গ্যাস সমৃদ্ধ দেশ মোজাম্বিকেও একই উপায়ে প্রভাব বিস্তার করেছে ওয়াগনার গ্রুপ। বিদ্রোহী বাহিনীকে পরাস্ত করার উপহার হিসেবে, ২০১৯ সালে মোজাম্বিকের সাথে খনিজ, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে রাশিয়া। ২০২১ সালে সাহেল অঞ্চলের চরমপন্থী দমনে, রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের মধ্যস্থতায়, মালির সাথে চুক্তি করে ওয়াগনার গ্রুপ।
বলতে গেলে এভাবে পুরো আফ্রিকায় রাশিয়ার মদদপুষ্ট এই ভাড়াটে বাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু আফ্রিকায় নয়, ইউক্রেন যুদ্ধেও তাদের যুক্ত থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ উঠেছে, ওয়াগনার গ্রুপ আফ্রিকায় বেসামরিক নাগরিকদের উপর অত্যাচার করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই গ্রুপের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপটিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেছে।
কিন্তু এসব পদক্ষেপ কি পারবে দুর্ধর্ষ বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে? নাকি রাশিয়ার এই আগ্রাসন চলতেই থাকবে আফ্রিকায়? সেটা জানতে হলে সামনের দিন গুলোতে চোখ রাখতে হবে।