যুদ্ধে জড়িয়েছে রাশিয়া এবং ইউক্রেন। মিত্র শক্তির ভূমিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুদ্ধের বাজারে লাভের স্বপ্ন দেখছে আরেক পরাশক্তি চীন। খোলা চোখে এমন মনে না হলেও বাস্তবতা বলছে সেই কথা। বৈশ্বিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের কারণে ফায়দা নিতে শুরু করেছে এশিয়ান পরাশক্তি।
ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধের এক বছর পর আচমকা দৃশ্যপটে শক্ত অবস্থান নিয়ে হাজির হয়েছে চীন। অত্যন্ত সুকৌশলে এমন এক পরিস্থিতির তৈরি করা হয়েছে, যেখানে চীনের উপর নির্ভর করে থাকতেই হচ্ছে সবাইকে।
একদিকে রাশিয়ার কাছে অস্ত্র বিক্রির সম্ভাবনা, অন্যদিকে শান্তিচুক্তির ১২ দফা। আবার অস্থির এই সময়ে নিজের দেশকে পুনরায় নতুন করে ঢেলে সাজানোর তাগিদ।
তাই সবমিলিয়ে বলাই যায়, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ব্যস্ত আছেন পুরোদমে।
সম্প্রতি চীনের তেল ক্রয় সংক্রান্ত দৌড়ঝাঁপ জন্ম দিয়েছে নতুন আলোচনার। একদিকে রাশিয়া, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দুই প্রান্ত থেকেই বড় ধরণের তেলের চালান আসছে বেইজিংয়ে।
আর তেলের পরিমাণও কম নয়। তেল পরিবহণের জন্য অন্তত দশটি সুপার ট্যাংকার জাহাজ ভাড়া করেছে দেশটি। এর প্রতিটি জাহাজে দুই বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল ধরে। সারাবিশ্বে করোনার প্রভাব কমে এলেও চীনে রয়ে যায় এর ছাপ।
২০২৩ সালের শুরু থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার মিশনে নেমেছে চীন। ইতিমধ্যে অর্থনীতির শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে নতুন চারজনকে। আর ঠিক এমন অবস্থায় বিপুল পরিমাণের অপরিশোধিত তেল কিনছে দেশটি।
চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ব্যাপক অর্থ খরচ হয়েছে তাদের। অনেকটা বাধ্য হয়েই দেশের পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জো বাইডেন।
আর সেই তেলের ক্রেতা চীন। চীনের খনিজ তেল বিষয়ক প্রধান দুই সংস্থা ইউনিপ্যাক এবং সাইনোপ্যাক। দুই কোম্পানিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে যাচ্ছে এবার। চীনের এই বিশাল পরিমাণ তেল কেনার পেছনে আছে বড় ধরণের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য।
২০২২ সালে কোভিড সংক্রান্ত নীতিমালা বাতিল করেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। বাড়তে শুরু করে চীনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। ধীরে ধীরে এর প্রভাব এসেছে সারা বিশ্বেই। প্রতিনিয়ত বাড়ছে তেলের চাহিদা।
আর এখানেই আছে চীনের রহস্য। চাহিদা বাড়ার আগেই বড় রকমের মজুদ করতে চায় তারা। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ রেখেছে বহু দেশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রাশিয়া থেকেও তেল আমদানি করছেন শি জিন পিং।
ধারণা করা হচ্ছে, যেকোনো মুহুর্তে তেল বিক্রির সাথেও সম্পৃক্ত হতে শুরু করবে এশিয়ার এই সুপার পাওয়ার।
আর একই সময়ে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যও অনেকটা বাড়িয়েছে চীন। ২০২২ সালের প্রথম চার মাসে চীন এবং রাশিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। চীনে রাশিয়ার রপ্তানিও এসময় ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
এই সংখ্যা সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি বাড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে অনেকটা চীনের উপরেই নির্ভর হয়ে দিন পার করছে রাশিয়া। ২০২৩ সালে দুই দেশের বাণিজ্যিক সব চুক্তি চীনের মুদ্রাতেই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমনকি চীনের বিভিন্ন কোম্পানি এবং ব্র্যান্ড খুব দ্রুতই রাশিয়ান বাজারে প্রবেশ করতে চলেছে। একইসাথে দুই দেশের শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতে অংশীদার হবার জোর সম্ভাবনাও আছে।
এর বাইরে শান্তি প্রস্তাবের ইস্যুতে এরইমাঝে ইউক্রেনের দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছেন শি জিন পিং। তেলের মজুদ, রাশিয়ার বাজারে প্রবেশ আর শান্তি প্রক্রিয়া দিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে নিজের প্রভাব আরও বেশি বড় করছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। আর এর কোনো একটিতেও যদি সফলতা আসে, তবে আগামীদিনের বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে যাবে চীন।