ক্ষমতায় নেই তবু ক্ষমতায় থাকা মানুষদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। পৃথিবীর অন্যতম বড় সামরিক শক্তির দেশটি তাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রভাবক। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব এতই বড়, যে কোন সময় চাইলেই রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে তারা।
স্বাধীনতার পর বিগত ৭৫ বছরে বারবার এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে পাকিস্তানের রাজনীতি। দেশটিতে স্বাধীনতার পর নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এসেছে ২৩ বার। এদের মাঝে মেয়াদ পূর্ণ করা হয়নি কারোরই। শুধু নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীদের উৎখাত করেই ক্ষান্ত হয়নি দেশটির সেনাবাহিনী। বরং কখনো নিজেরাই ছিলো শাসকের ভূমিকায়।
স্বাধীন পাকিস্তানের ৭৫ বছরের মাঝে ৩৩ বছরই কেটেছে সেনা শাসনের অধীনে। এদের মধ্যে আইয়ুব খান এবং জিয়া উল হক ক্ষমতায় ছিলেন দশ বছর করে। আর পারভেজ মোশাররফের ক্ষমতার মেয়াদ ছিলো ৭ বছরের কিছু বেশি।
কিন্তু কি কারণে এত প্রভাব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর। কেনই বা সবাইকেই আপোষ করতে হয় তাদের সাথে। কোন অজ্ঞাত কারণে পাকিস্তানের রাজনীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির সেনাবাহিনী।
এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের জাতীয় ইতিহাসের সাথে। ১৯৪৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অল্প কদিন পরেই স্বাধীনতা পায় পাকিস্তান। দেশটি এমন পর্যায়ে স্বাধীনতা অর্জন করে যখন সারা বিশ্বই নিজেদের সামরিক দক্ষতা বাড়াতে চেয়েছিলো। বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে। অনেকটা বাধ্য হয়েই তাই ভবিষ্যত বিবেচনায় নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে শুরু করেছিলো বিশ্বের প্রায় সব দেশ।
পাকিস্তানেও এর খুব বেশি ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পর প্রাথমিকভাবে সামরিক বাজেট ছিলো সবচেয়ে বেশি। দেশের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ ব্যয় হতো সামরিক বাহিনির কল্যাণে। এমনকি এখনও দেশের মোট বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ থাকে সেনাবাহিনীর জন্য।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কদিনের মাঝেই দেশটির শাসন ব্যবস্থায় সামরিক-বেসামরিক যৌথ অংশীদার ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয় জরুরি সময়ে সরকার উৎখাতের ক্ষমতা। সামরিক প্রধানের Doctrine in necessity নামক সাংবিধানিক পদবির জেরে এই ক্ষমতার চর্চা চলতে থাকে।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধের পর সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে পাক সেনাবাহিনী। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, সেনাবাহিনীর পক্ষেই দেশের ভেতরের এবং বাহিরের শত্রুদের দমন করা সম্ভব।
এমন বিশ্বাসের সূত্র ধরে খুব দ্রুতই দেশের শাসন ব্যবস্থার উপর জেঁকে বসে সেনাবাহিনী। আইয়ুব খান প্রথম সেনা সরকারের শুরু করেন। এরপর তিনি নিজেও গণতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। এভাবেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার ব্যবস্থার মাঝেও খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশে যায় সেনাবাহিনী।
সত্তরের দশকে ক্ষমতায় আসেন জিয়া উল হক। এসময় পাকিস্তানের যাবতীয় বেসামরিক খাতে যুক্ত হতে থাকে সেনাবাহিনী। কৃষি, শিক্ষা থেকে শুরু করে শিল্প এবং সেবা খাতেও প্রভাব বাড়াতে থাকে তারা। এমনকি বিভিন্ন ব্যবসার সাথেও যুক্ত হতে থাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিমন্ডলের বাইরে সামাজিকভাবেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেয় তারা।
পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর প্রভাব এতই বেশি, বৈদেশিক বা কূটনৈতিক সম্পর্কের চাবিও থাকে সেনাসদরের কাছে। কোন দেশ পাকিস্তানের শত্রু বা কোন দেশ মিত্র তাও নির্ধারণ করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।
অবশ্য এর পেছনে আছে যৌক্তিক কারণ। পাকিস্তানের সুসংগঠিত গোয়েন্দা সংস্থা বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে বিভিন্ন দরকারি বিষয় সরকারের কাছে প্রকাশ করে। সেখান থেকেই দেশ পরিচালনা কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ তথ্য পায় পাকিস্তান। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই সেনাবাহিনীর সাথে সুসম্পর্ক রাখতে বাধ্য পাকিস্তানের নির্বাচিত সব সরকার।
এমনকি বিগত দুই দশক ক্ষমতায় না এসেও দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরণের ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। কদিন আগেই ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয় ইমরান খানকে।
পাকিস্তান তেইরিক-ই-ইনসাফ প্রধানের বিপুল জনসমর্থন থাকলেও তা খুব বেশি কাজে আসেনি। ধারণা করা হচ্ছিলো, নিজ মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে সেনাবাহিনীর সাথে দূরত্ব বাড়ছিল ইমরানের। যার ফলাফল মেয়াদ হিসেবে পূর্ণ করার আগেই বিদায় বলতে হলো তাকে।