নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে হয়ত এমন চ্যালেঞ্জের মুখে আগে কখনোই পড়তে হয়নি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে। দেশের ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি আর অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আগে থেকেই চাপে ছিলেন এরদোগান। তার সাথে যেন প্রকৃতিও এবার সঙ্গ দিচ্ছে না তাকে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর নতুন করে চ্যালেঞ্জ বেড়েছে তার উপর।
এরদোগানের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দাবী, প্রেসিডেন্টের চোখের সামনেই অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। যার কারণে ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে।
দুই দশকের এরদোগান শাসনের শেষ দেখতে এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে তুরস্কের বিরোধী পক্ষ। এরদোগানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এর বিপরীতে জোট বেঁধেছে দেশের ৬ টি বিরোধী দল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই ৬ দলের পক্ষ হয়ে এরদোগানকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন কামাল কিলিচদারোগ্লু।
৭৪ বছর বয়েসী কামাল কিলিচদারোগ্লু পুরো তুরস্কেই তার নম্র স্বভাব এবং ঠান্ডা মেজাজের জন্য পরিচিত। চলনে বলনে ভারতের মহাত্মা গান্ধীর সাথে তার মিল পান অনেকেই। যার কারণে তাকে “কামাল গান্ধী” কিংবা “তুরস্কের গান্ধী” সম্বোধনও শুনতে হয়।
দুই মাস বাকি থাকলেও এখনই নির্বাচন ঘিরে আশাবাদী কামাল কিলিচদারোগ্লু। এরদোগান প্রশাসনের সাম্প্রতিক ব্যর্থতাই আলো দেখাচ্ছে তাদের। এরইমাঝে নির্বাচনে জয়লাভ করলে এরদোগানের সব নীতিই বদলে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন তিনি।
বিশেষ করে তুরস্ককে সংসদীয় পদে ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন করে তোড়জোড় শুরু করেছে বিরোধী পক্ষ। সেক্ষেত্রে আবারও তুরস্কে প্রধানমন্ত্রীর পদ ফিরিয়ে আনা হবে। এবং কোন প্রকার রাজনৈতিক দায়িত্ব ছাড়াই প্রেসিডেন্ট নিরেপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন।
চুক্তি অনুযায়ী, নির্বাচিত হলে আগামী সাত বছর প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন কামাল কিলিচফারোগ্লু। আর এরপরই সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেবেন তিনি।
তবে এসবের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশের অর্থনৈতিক খাত ঘিরে। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের মুদ্রা লিরার ব্যাপক পরিমাণ দরপতন ঘটেছে। যার কারণে অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে দিন কাটাচ্ছে দেশটি।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরদোগান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর নীতি এখন পর্যন্ত প্রণয়ন করতে পারেননি। এমনকি মুদ্রাস্ফীতি কমানোর বদলে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে লিরার দরপতন কমেনি।
অর্থনীতিতে এরদোগানের এমন ব্যর্থতার সুবাদে আশাবাদী হয়ে উঠেছে বিরোধী পক্ষ। কেবলমাত্র এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই সরকার ব্যবস্থাকে এরদোগানকে সরানো সম্ভব বলেই বিশ্বাস করেন তারা। তাদের বিশ্বাস, তুরস্কে নিজস্ব স্টাইলে সংসদীয় গণতন্ত্র পূণরায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন তারা। ২০১৭ সালে এক গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করেন এরদোগান।
নেশন অ্যালায়েন্স প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতেই মুদ্রাস্ফীতি একক অংকে নামিয়ে আনা হবে। বিগত দুই বছরের মধ্যে যা আর কখনোই ঘটেনি। বর্তমানে দেশটিতে ৫৫% মুদ্রাস্ফীতি রয়েছে। এছাড়াও তারা তুর্কি লিরার স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। গত পাঁচ বছরে তুরস্কের এই মুদ্রা তার মূল্যের ৮০% হারিয়েছে।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, নেশন অ্যালায়েন্স কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এবং মন্ত্রিসভাকে গভর্নর নির্বাচনের অনুমতি দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো ফিরিয়ে আনবে।
এছাড়াও তারা সংসদকে ব্যাংকের মিশন, অপারেশনাল স্বাধীনতা এবং উচ্চ-স্তরের নিয়োগের বিষয়ে আইন পাস করার অনুমতি দেওয়ার জন্য আইন তৈরি করবে।
চলমান অর্থনৈতিক সংকটে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপের প্রস্তাবনাও রেখেছে তারা। প্রেসিডেন্সির ব্যবহৃত বিমানের সংখ্যা, বেসামরিক কর্মচারীদের ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যা এবং কিছু রাষ্ট্রীয় ভবন বিক্রি করে সরকারি ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
যদিও এসব চ্যালেঞ্জে এখনই ভড়কে যাচ্ছেন না বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। ক্যারিশম্যাটিক লিডার খ্যাত এই নেতা এখন পর্যন্ত নিজের জয় নিয়ে ব্যাপক আত্মবিশ্বাসী। ২০০২ সাল থেকেই তুরস্কের ক্ষমতায় আছেন এরদোগান। তুরস্কের সেক্যুলারপন্থী দলগুলোকে শত্রু আখ্যা দেন তিনি। আর নিজের দলকে তিনি পরিচালনা করছেন নব্য ইসলামিস্ট হিসেবে। সবমিলিয়ে ১৪ মে এর নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ নিতে মুখিয়ে আছেন এরদোয়ান নিজেও।