বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও একবার নিজের শক্ত উপস্থিতি জানান দিলো এশিয়ান সুপারপাওয়ার চীন। তাদের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক চুক্তি সাক্ষর করলো পারস্য উপসাগর তীরের দুই দেশ ইরান এবং সৌদি আরব। দীর্ঘ ৭ বছর পর আবারও নিজেদের মাঝে কূটনৈতিক পর্যায়ের সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হয়েছে মুসলিম বিশের শক্তিধর এই দুই দেশ।
এক ঘোষণায় জানা যায়, এই দুই দেশের মাঝে আবার নতুন করে বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাও শুরু হবে। সেই সাথে আগামী দুই মাসের মাঝে খুলে দেয়া হবে দুই দেশের দূতাবাস। আর এমন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে মূখ্য ভূমিকায় ছিলো চীন।
চীনের এমন যুগান্তকারী অবস্থানের পর দেশটিকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সৌদি আরব এবং ইরান। এছাড়াও এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে চীনের অবস্থান আরও বেশি শক্ত হলো।
মাত্র ৪ দিনের বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের মাঝে বরফশীতল সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সক্ষম হয়েছে চীন। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে বৈঠক শেষে ঐতিহাসিক এই ঘোষণা নিয়ে হাজির হন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিনিধি ছিলেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপদেষ্টা মুসাদ বিন মোহাম্মদ আল আইবা। ইরানের পক্ষে ছিলেন সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী শামখানি।
এসময় তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান সেন্ট্রাল ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিশনের পরিচালক ওয়াং ই।
এদিকে চুক্তির পরপর দুই দেশকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। চুক্তির পরপরই ওয়াং ই বলেন, বর্তমান অশান্ত সময়ে ইরান এবং সৌদি আরবের এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপন একটি “গুরুত্বপূর্ণ সুসংবাদ”। এই চুক্তিকে তিনি আলোচনা ও শান্তির এক “বিজয়” বলে অভিহিত করেন।
এসময় তিনি আরও বলেন, চীন বিশ্বের বিবাদমান দেশগুলোর মাঝে এমন গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে যাবে।
এমন যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইরাক, আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, বাহরাইন এবং মিশরের মত আরব বিশ্বের সকল দেশ। এমনকি ইয়েমেনে ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহী গ্রুপও এই আলচনাকে স্বাগত জানিয়েছে।
তবে এই শান্তি আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত ছিলো না বলে নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউজ মুখপাত্র জন কিরবি। তিনি জানান, সৌদি আরব এই আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আগেই জানিয়েছে। তবে এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোন সংযোগ নেই।
উল্লেখ্য ২০১১ সাল থেকেই বিভিন্ন পটভূমিতে খারাপ হতে শুরু করে ইরান এবং সৌদি আরবের সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত সৌদি আরব। অন্যদিকে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে বৈরিভাব চলে আসছে।
এরমাঝে ২০১১ সালে আরব বিপ্লব চলাকালে বাহরাইনে উস্কানির জন্য ইরানকে দায়ী করে সৌদি আরব। একই বছর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায় দুই দেশ। শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত ইরান সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন দেয়। আর বিদ্রোহী গ্রুপের পক্ষে নিজেদের সমর্থন জানায় সৌদি আরব।
আবার ২০১৫ সাল থেকে চলা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব। আর বিদ্রোহি হুতি গ্রুপকে সমর্থন জানায় ইরানের সরকার। এমনকি হুতি বিদ্রোহীদের অস্ত্র এবং সামরিক সাহায্যও দিয়ে আসছে ইরান।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে তিক্ত অধ্যায় ছিল ২০১৫ এবং ২০১৬ সাল। ২০১৫ সালে মক্কায় পবিত্র হজ্জ্ব পালন করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে বহু মুসলমান মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনার জন্য সরাসরি সৌদি আরবের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে ইরান। সেবার ইরানের কমপক্ষে ৪০০ হজযাত্রী মারা যান।
এর কিছুদিন পর ২০১৬ সালে সৌদি আরব দেশটির প্রখ্যাত শিয়া নেতা আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এর প্রতিবাদে তেহরানে সৌদি আরবের দূতাবাসে হামলা চালায় ইরানের সাধারণ মানুষ। যার কারণে দূতাবাস এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব।
চূড়ান্ত প্রতিবাদ হিসেবে ইরান তাদের নাগরিকদের সেই বছরের জন্য হজ অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয়। সেইসাথে হজ্জ্ব নিয়ে রিয়াদের আধিপত্য কমানোর জন্য বিশ্ববাসীকে চিন্তার পরামর্শ দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি।
পরবর্তী বছরগুলোতে এই নিয়ে দ্বন্দ আরও বেশি বৃদ্ধি পেলে দুই দেশের পক্ষে সম্পর্ক চালিয়ে নেয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। যার প্রায় ৭ বছর স্থায়ী ছিলো। আর সেই কঠিন সম্পর্কেরই ইতি টানা হলো চীনের মধ্যস্থতায়।