আছে প্রেসিডেন্ট, আছে পার্লামেন্ট, আছে নাগরিকদের ভোটের অধিকার; কিন্তু এরপরেও অনেক বেশি প্রভাবশালী আলী খামেনেয়ী। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।
দেশের প্রায় সব ক্ষমতাই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। ৮৩ বছর বয়েসী এই ধর্মীয় নেতার নির্দেশেই পরিচালিত হয় পুরো ইরানের কার্যক্রম।
আলী খামেনেয়ীর এমন দাপটের শুরুটা হয়েছিল আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর হাত ধরে। বিজ্ঞ এই শিয়া নেতা দেশটির ইসলামিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বলতে গেলে তিনি এককভাবে ইরানের শেষ শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
ব্রিটিশপন্থী শাসক রেজা শাহ পাহলভীর বিরুদ্ধে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজটি সফলভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন খোমেনি। ইরানের জনগণের কাছে তিনি হয়ে উঠেন চোখের মণি।
ক্ষমতায় শীর্ষে ওঠার পরেই দেশের সকল সম্পদ জাতীয়করণের ঘোষণা দেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। এই ঘোষণার পর তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। যার প্রভাবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি টিকে যান।
তার প্রয়াণের পর ইরানে দরকার ছিলো নতুন এক নেতৃত্ব। সেই জায়গায় একমাত্র উপযুক্ত ছিলেন আলী খামেনেয়ী। যিনি এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
আলী খামেনেয়ী ক্ষমতায় আসার পর পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের আদর্শ পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে। ইরানের জনগণের পক্ষে তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কড়াকড়ি, ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের সাথে মুখোমুখি অবস্থান তাকে আরও অনেক বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে।
তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন পারমাণবিক শক্তি অর্জনে। তার নেতৃত্বেই পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে ইরান। যা তাকে ইরান তো বটেই, পুরো মুসলিম বিশ্বেই ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে।
এসব কারণেই ইরানে অপ্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠেন আলী খামেনেয়ী। তার অধীনে এখন পর্যন্ত চার জন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে ইরান। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন খামেনেয়ীর প্রিয়পাত্র।
তবে এক পর্যায়ে নিজের মত করে রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বাদ পড়েছেন কিংবা ব্যাপক বিতর্কেও উতরে গেছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মাহমুদ আহমেদিনেজাদ।
এক সময়ের ব্যাপক জনপ্রিয় এই প্রেসিডেন্ট প্রথম মেয়াদের শেষদিকে বিতর্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু অর্থনীতির ব্যাপক ধ্বসের পরেও তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
তার এই নির্বাচনের পর ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। এটি ছিলো ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। তবে আলী খামেনেয়ী জানান, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিলো। পরবর্তীতে এই বিক্ষোভ থেকেই হাজারো ব্যক্তি আটক হয়েছিলো।
আহমেদি নেজাদের পর ইরানের ক্ষমতায় এসেছিলেন হাসান রুহানি। শুরুতে আলী খামেনেয়ীর আশীর্বাদ নিয়ে পরমাণু চুক্তির মত বড় কাজও করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সংস্কারপন্থী এই প্রেসিডেন্টও শেষ পর্যন্ত হালে পানি পায়নি। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি থেকে সরে এলে এর কড়া সমালোচনা করেন আলী খামেনেয়ী।
হাসান রুহানির মেয়াদের শেষদিকেও আবার বিক্ষোভে নামে ইরানের জনগণ। সেবারই প্রথম আলী খামেনেয়ীর বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয়া হয়।
এরপর ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানি প্রাণ হারান। সেবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
এরপর আবারও বাড়তে থাকে তার জনপ্রিয়তা। মূলত মার্কিন বিরোধী মনোভাব জিইয়ে রাখা, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান তাকে বারবারই দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে রেখেছে।
বিভিন্ন সময় পারমাণবিক শক্তির সফল প্রয়োগ এবং বড় সামরিক শক্তি অর্জনের কারণে বিশ্বব্যাপীও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে আলী খামেনেয়ীর। মধ্যপ্রাচ্যে এবং পারস্য উপসাগর তীরের ৮ দেশের সবখানেই মার্কিন সেনাঘাঁটি থাকলেও, ইরানে এখন পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারেনি।
অবশ্য সম্প্রতি মাশা আমিনির ঘটনায় ইরানে বড় আকারের আন্দোলন শুরু হয়েছে। এই আন্দোলনে বহু মানুষ আলী খামেনেয়ীর ক্ষমতা হ্রাসের পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু দেশটিতে তার শক্ত অবস্থান ও জনপ্রিয়তার কারণে সেটিও সম্ভব হয়নি।