গেল মাসে ইউক্রেনে যুদ্ধ থামাতে একটি শান্তিচুক্তির প্রস্তবনা দেয় চীন। সে চুক্তিতে রাজি ছিল রাশিয়া, তবে একঘেয়েমি করেছে ইউক্রেন তথা মার্কিনিরা।
বারো দফা সে প্রস্তবনায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো রাশিয়ার উপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং ইউক্রেনকে অবাধে গম রফতানির সুযোগ দেওয়া।
তবে রুশ সেনাদের ইউক্রেনের ভুমি ত্যাগ করার ব্যপারে কিছুই উল্লেখ ছিলো না সে প্রস্তাবে। এসব কারনে এখন পর্যন্ত ওই প্রস্তাবটিতে কোন সাড়া দেয়নি পশ্চিমা বিশ্ব।
বরংচ পালটা আক্রমন হিসেবে যুদ্ধে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পুতিনের বিরুদ্ধে ,এবং আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে জারি করা হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা।
আর এত কিছুর মধ্যেই তড়িঘড়ি করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ,খোদ রাশিয়া গিয়ে দেখা করার প্রস্ততি নিচ্ছেন চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং।
তার এই সফরের আনুমানিক সময় ধরা হচ্ছে চলতি মাসের একুশ কিংবা বাইশ তারিখ। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সফরের বিস্তারিত গোপন রেখেছে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।
বিশ্লেষকেরা ধারনা করছেন শি জিনপিংএর এই আকস্মিক সফরের মুল উদ্দেশ্য ইউক্রেনে যুদ্ধরত বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা।
ঐতিহাসিকভাবে চীন ভিনদেশের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনা। তবে সম্প্রতি তারা ইরান এবং সৌদি আরবকে একত্র করে তাদের দীর্ঘদিনের দূরত্ব দূর করেছে।
তাদের মধ্যকার এই শান্তিচুক্তি প্রমান করে , চীন শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দিয়ে বিশ্বমহলে নিজেদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়াতে চাইছে।
ইউক্রেন এবং রাশিয়া সঙ্ঘাতে পশ্চিমারা সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষ নিয়েছে। তাই তাদের কথা পাত্তা দিতে চাইবেনা রাশিয়া। অপরদিকে পুরো সময় নিরপেক্ষ ছিল চীন।
তারা ইউক্রেন কিংবা রাশিয়ার কোন ক্ষতি করেনি। সেই সাথে তাদের সামরিক শক্তিও রয়েছে। ফলে যুদ্ধরত দুই পক্ষের কাছেই অত্যন্ত গ্রহনযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে চীনকে।
যদিও বেশ কয়েকবার তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তারা সামরিক ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোতে মস্কোকে অনেকটা অন্ধ সমর্থন দিয়ে এসেছে।
তবে চীন যদি ইউক্রেন এবং রাশিয়াকে আলোচনার জন্য এক টেবিলে বসাতে পারে তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের ভাবমুর্তী আবারো উজ্জ্বল হবে।
আর ইতিবাচক ফলাফল আসলে এই পদক্ষেপ হবে যুগান্তকারী। পুর্বে চীন প্রস্তাবিত বারো দফার শান্তি চুক্তি নিয়ে খুব বেশি অসন্তুষ প্রকাশ করেনি ইউক্রেন সরকার।
তবে এখানে সবচেয়ে বেশি বাধার সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ানরা । মুলত রাশিয়ার উপর বেশিরভাগ নিষেধাজ্ঞা এসেছে তাদের পক্ষ থেকে।
তাই চুক্তি অনুযায়ী যদি রাশিয়ার উপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে হয় তাহলে এই চুক্তিতে অবশ্যই পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন যোগাড় করতে হবে চীনকে।
অবশ্য পেন্টাগন একাধিকবার দাবি করেছে বেইজিং সবার সামনে নিরপেক্ষ ভুমিকা পালন করলেও তারা গোপনে রাশিয়াকে যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার জন্য অস্ত্র পাঠাচ্ছে।
অপরদিকে পশ্চিমাদের জোট ন্যাটো বলেছে চীনের মত পক্ষপাতদুষ্ট দেশের পক্ষে এই যুদ্ধে কোন ধরনের নিরপেক্ষ সমাধান করা সম্ভব নয়।
এছাড়া ইউক্রেনের এই সঙ্ঘাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে তুর্কি। তবে তাদের আভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভয়াবহ ভুমিকম্পের পর তারা এসব বিষয়ে আগ্রহ হারিয়েছে।
তুরষ্ক এখন নিজেদের অর্থনীতির দিকে মনযোগ দিচ্ছে বেশি। তাই এই ক্ষেত্রে চীন তাদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন চীনের মধ্যস্থতা চেষ্টার মুল উদ্দেশ্য পশ্চিমাদের কিছুটা চাপে ফেলা।
যদি চীন সফল হয় তাহলে মার্কিনিরা কিছুটা ব্যাকফুটে পড়বে। আবার যদি চীন এই চেষ্টায় ব্যার্থ হয় তাহলে বলবে আমরা অন্তত সব কিছু ঠিক করার চেষ্টা করেছি।