পৃথিবীর বুকে ধূমকেতু আঘাত হানার সম্ভাবনা প্রতি ১০০ মিলিয়নে মাত্র ১ বার !!
প্রাচীন কালে মানুষ ধুমকেতু সম্পর্কে তেমন কিছু জানতো না । চাইনিজরা ধূমকেতুকে বলতো “ব্রুম স্টার “ । সেই সময়ে মানুষ মনে করতো গুরুত্বপূর্ন কোন ব্যাক্তি মারা যাওয়ার আগে আকাশে ধুমকেতু দেখা যায় । আবার এমন ধারণাও প্রচলিত ছিল যে ভূমিকম্প হওয়ার আগে আকাশে ধুমকেতু দেখা যায় ।
১৭শ শতকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয় ,ধুমকেতু মূলত সূর্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তন করে । হ্যালীর ধূমকেতু প্রথম দেখা গিয়েছিল ১০৬৬ সালে । বিজ্ঞানী হ্যালি প্রমান করেন , ধুমকেতুগুলো একটা নিদৃষ্ট সময় পর পর সুর্যকে প্রদক্ষিন করে । তিনি জানান ১৫৩১ এবং ১৬০৭ সালে যে ধুমকেতু দেখা গিয়েছিল সেটি একই ধুমকেতু । তিনি অনুমান করেছিলেন এই একই ধুমকেতু আবার দেখা যাবে ১৬৮২ সালে । তাঁর কথা সত্যি হয়েছিল ,যদিও তিনি তখন বেঁচে ছিলেন না ।
কমেট বা ধূমকেতু পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলোর মতোই সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকে ।
ধূমকেতু বরফ ,ধুলো এবং পাথর দিয়ে গঠিত । ধুমকেতুতে এমন কিছু উপাদানও রয়েছে যেগুলো সোলার সিস্টেম তৈরির একদম শুরুর দিকে ছিল ।
ধূমকেতু আসে কোথা থেকে ?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন ধূমকেতুর উৎপত্তি ওয়র্ট ক্লাউড থেকে । ওয়র্ট ক্লাউন্ড হচ্ছে এমন একটি জায়গা যেটা আমাদের পরিচিত সোলার সিস্টেমের বাইরে অবস্থিত । এটি বরফ দিয়ে গঠিত একটি মেঘমন্ডল ।
ধূমকেতুর আরেকটি উৎস হলো কুইপার বেল্ট । কুইপার বেল্ট লক্ষ লক্ষ বরফ খন্ডের সমন্বয়ে গঠিত একটি রিং বিশেষ যেটি নেপচুন গ্রহের কাছে অবস্থিত । ধারণা করা হয় , কুইপার বেল্ট থেকেই বেশিরভাগ ধূমকেতুর আবির্ভাব হয় । কুইপার বেল্টের বরফের টুকরো গুলো সূর্য বা অন্য কোন গ্রহের আকর্ষনে ছুটে বের হয়ে আমার পরিচিত সোলার সিস্টেমে প্রবেশ করে ।
ধূমকেতু সাধারণত উপবৃত্তাকার পথে সূর্যকে প্রদক্ষিন করে থাকে । স্বল্প সময়ের জন্য যে ধূমকেতুগুলো দেখা যায় সেগুলো ২০ বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিন করে থাকে । আর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যে ধূমকেতু দেখা যায় সেগুলো ২০০ বছর বা তার বেশি সময়ে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিন করে । উপবৃত্তাকার পথে ভ্রমণের সময় যখন সূর্যের কাছাকাছি থাকে তখন ধুমকেতুর গতি থাকে ঘন্টায় ১ লক্ষ মাইল এবং সূর্য থেকে যতোই দূরে সরতে থাকে ধুমকেতুর গতিবেগ ততো কমতে থাকে । সুর্য থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা অবস্থায় গতিবেগ হয় ঘন্টায় ২ হাজার মাইল ।
একটা ধুমকেতুর মধ্যে ৩ টা অংশ থাকে । নিউক্লিয়াস ,কমা এবং লেজ । ধুমকেতুর নিউক্লিয়াস হচ্ছে একটা কঠিন আবরণ যেটি ধূলো ,পাথর এবং বরফ দিয়ে গঠিত । নিউক্লিয়াসের চারপাশে থাকে কমার মতো অংশ যা গঠিত হয় বিভিন্ন প্রকার গ্যাস দিয়ে । আর ধূমকেতুর লেজ হচ্ছে সেই অংশটি যেটি ধুমকেতুর মাঝে থাকা যে কোন গ্যাসের কারণে জ্বলে উঠে ।
আমরা সাধারণত ধুমকেতুর লেজ এবং কমা অংশটি দেখে থাকি । গতির কারনে কমার মধ্যে থাকা গ্যাসগুলো জ্বলে উঠে এবং পেছন দিকে ছড়িয়ে লেজের সৃষ্টি করে । নিউক্লিয়াস বা ধুমকেতুর কেন্দ্র তখন দেখা যায় না ।
একটা ধূমকেতুর ব্যাস ১ কিলোমিটার থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে । ৩০০ কিলোমিটার ব্যাস সম্পন্ন ধূমকেতুগুলোকে বলা হয় চিরন ( Chiron) .
১৪৯১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী C1491 -B1 নামের একটি ধূমকেতু পৃথিবীর এক দশমিক চার মিলিয়ন কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছিল । তবে এরকম ঘটনা এটাই শেষ নয়
পৃথিবীর নিকট দিয়ে অতিক্রমকারী আরেকটি ধূমকেতুর নাম হচ্ছে লেক্সেল । এটি ১৭৭০ সালে দেখা গিয়েছিল । ধুমকেতুটি পৃথিবীর দুই দশমিক মিলিয়ন কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছিল ।
এখন পর্যন্ত ২৬ টি পিরিয়ডিক ধুমকেতুর কথা জানা গেছে যেগুলো পৃথিবীর খুব কাছে দিয়ে অতিক্রম করে । যদিও এখন পর্যন্ত সেগুলো পৃথিবীতে কোন আঘাত হানেনি । একটা গবেষনায় দেখা গেছে , পৃথবীর কাছ দিয়ে অতিক্রমকারী ধূমকেতুগুলোর আঘাত হানার সম্ভাবনা প্রতি ১০০ মিলিয়নে মাত্র ১ বার । কিন্তু সত্যি যদি আঘাত হানে তাহলে সেটা হবে ভয়ঙ্কর ।
তবে পৃথিবীর বুকে আঘাত না করলেও ১৯৯৪ সালে একটা ধূমকেতুর ২০ টি ভাঙা টুকরো জুপিটার গ্রহে আঘাত হেনেছিল ।