আন্তর্জাতিক


বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে ‘ধর্ষণ’ নয়: এলাহাবাদ হাইকোর্ট


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:২০ জুন ২০২৬, ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার

বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে ‘ধর্ষণ’ নয়: এলাহাবাদ হাইকোর্ট

দীর্ঘদিন ধরে চলা দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ককে কেবল বিয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার কারণে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা যায় না বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। সাম্প্রতিক এক রায়ে আদালত বলেছেন, কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্য প্রমাণিত না হলে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্ষণের অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি বিবেক কুমার সিংয়ের একক বেঞ্চ এই রায় দেন। একই সঙ্গে সঞ্জয় সরোজ ওরফে সঞ্জয় কুমার নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রায়াল কোর্টে চলমান ফৌজদারি কার্যক্রমও বাতিল করে দিয়েছেন আদালত।

 

কী বলেছে আদালত?

 

৩৪ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত উল্লেখ করেছে, কোনো নারী যদি স্বেচ্ছায় ও পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে একটি সম্পর্কে যুক্ত হয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তাহলে পরবর্তীতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা বিয়ে না হওয়ার ঘটনা একাই ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।

 

আদালত বলেছে, ধর্ষণের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি শুরু থেকেই বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার উদ্দেশ্যে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি কখনোই বাস্তবায়নের ইচ্ছা ছিল না।

 

রায়ে আদালত আরও মন্তব্য করেছে, প্রতিটি মামলার বাস্তবতা ও পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু বিয়ে না হওয়ার ঘটনাকে ভিত্তি করে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা আইনগতভাবে যথাযথ নয়।

 

মামলার পটভূমি

 

মামলার সূত্রপাত ২০১৯ সালে উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ জেলার কর্নেলগঞ্জ থানায় দায়ের করা একটি অভিযোগ থেকে।

 

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৪ সালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়াগরাজে আসা এক নারী সঞ্জয় সরোজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। পরবর্তীতে তিনি অভিযোগ করেন, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিযুক্ত তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং পরে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান।

 

নারীর অভিযোগে আরও বলা হয়, বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোর পাশাপাশি অভিযুক্ত তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও করেছেন।

 

তবে তদন্তে অভিযোগের পক্ষে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা প্রতিবেদনে শারীরিক নির্যাতনের সুস্পষ্ট চিহ্নও পাওয়া যায়নি বলে আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগকারী পরবর্তীতে অভিযুক্তকেই বিয়ে করেন

 

মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এফআইআর দায়েরের পর অভিযোগকারী নারী পরবর্তীতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই বিয়ে করেন।

 

আদালত এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে যে, মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে মনে হয় বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে অভিযোগটি দায়ের করা হয়েছিল।

 

রায়ে আদালত মন্তব্য করেছে, মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদাহরণ এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচার অব্যাহত রাখা ন্যায়বিচারের স্বার্থের পরিপন্থী হবে।

 

সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের উল্লেখ

 

এলাহাবাদ হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে প্রমোদ সূর্যভন পাওয়ার বনাম মহারাষ্ট্র সরকার এবং দীপক গুলাটি মামলার রায়ও রয়েছে।

 

এসব রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, বিয়ের প্রতিশ্রুতি তখনই ধর্ষণের অভিযোগের ভিত্তি হতে পারে, যখন প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রতিশ্রুতিটি শুরু থেকেই মিথ্যা ছিল এবং অভিযুক্তের উদ্দেশ্য ছিল প্রতারণা করা।

 

হাইকোর্টও একই নীতির পুনরাবৃত্তি করে জানিয়েছে, দীর্ঘ পাঁচ বছরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবার শারীরিক সম্পর্কের একমাত্র কারণ ছিল বিয়ের প্রতিশ্রুতি—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

 

আইনি কার্যক্রম বাতিল

 

সব দিক বিবেচনায় আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার মতো পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি নেই।

 

ভারতের বহুল আলোচিত ‘স্টেট অব হরিয়ানা বনাম ভজন লাল’ মামলায় নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে আদালত মন্তব্য করে, এই মামলার বিচার চালিয়ে যাওয়া হবে অযৌক্তিক এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।

 

ফলে অভিযুক্ত সঞ্জয় সরোজের বিরুদ্ধে চলমান সব আইনি কার্যক্রম বাতিল করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় এলাহাবাদ হাইকোর্ট।

 

তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, প্রতিটি মামলার বাস্তবতা ভিন্ন। তাই বিয়ের প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত অভিযোগে আদালতকে প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্দেশ্য পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

 


জনপ্রিয়


আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন

ওয়াশিংটনে ভয়াবহ দাবানল, সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহর ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। দাবানলে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০টি স্থাপনা পুড়ে গেছে এবং আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

ভারতীয় ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টে অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নের জবাব দেয়নি ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন

ভারতীয় ভিসার অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম জুমবাংলা। হাইকমিশনের ভিসা হেল্প ডেস্ক ও সাধারণ ইমেইল, উভয় ঠিকানায় পাঠানো ওই চিঠির এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টে ভারতীয় হাইকমিশনের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ

ভারতীয় ভিসার অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম জুমবাংলা। হাইকমিশনের ভিসা হেল্পডেস্ক ও সাধারণ ইমেইল—উভয় ঠিকানায় পাঠানো ওই চিঠির এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার তীব্র প্রতিবাদ ভারতীয় মুসলিমদের

‘বন্দে মাতরম’কে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা এবং এর অবমাননাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারতের মুসলিমদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড।