সেনাবাহিনী থাকতেও বর্ডারে বিজিবি কেনো রেখেছে বাংলাদেশ? সেনাবাহিনীর সদস্যের সংখ্যা এবং সক্ষমতা তো কম নয়, তবুও আরেকটি বাহিনী দিয়ে কেনো রক্ষা করতে হচ্ছে দেশের সীমান্ত?
উত্তর হচ্ছে, সীমান্তে চাইলে কোনো দেশ সেনা মোতায়েন করতে পারবে না। এ নিয়ে অদ্ভূত এক নিয়মের চল রয়েছে বিশ্বে!
সেই নিয়ম অনুযায়ী শুধুমাত্র যুদ্ধকালীন সময়েই সীমান্তে সেনা মোতায়েন করা যাবে, অন্যথায় স্বাভাবিক সময়ে সীমান্ত রক্ষার ভার চাপানো যাবে না দেশের সেনাবাহিনীর ওপর!
শুধু তাই নয়, সীমান্তে যদি কোনো দেশ সেনা মোতায়েন করতে চায় তাহলে তা অবশ্যই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে অবগত করতে হবে। এজন্যই সীমান্ত পাহারায় সেনা মোতায়েন করতে পারে না বাংলাদেশ!
এই আইনানুযায়ী একটি বিশেষ দূরত্বের কথা বলা হয়েছে। সীমান্ত থেকে এগিয়ে ৫ থেকে ৮ মাইলের মধ্যে খাটবে না এই নিয়ম!
তবে বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ যাকে ভারত ঘিরে রেখেছে ৩ দিক দিয়েই। অন্যদিকে দক্ষিণেই রয়েছে মিয়ানমারের মতো অসহযোগী একটি দেশ!
ভৌগোলিক এ অবস্থানই বলে দেয়, সামরিক কোনো পাহারা ছাড়া এই দেশটির সীমান্ত ফেলে রাখা মোটেও নিরাপদ নয়।
দেশ ও জনগণের স্বার্থে, সীমান্তের একদম শূন্য রেখা থেকেই প্রয়োজন কড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার! তবুও নিয়মেরে বেড়াজালে সেনা মোতায়েন ছিলো অসম্ভব!
আর এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই উৎপত্তি বর্ডার গার্ডের! আইন অনুযায়ী যেহেতু সীমান্তে কোনো সামরিক বাহিনীর অবস্থান নেয়া মানা, তাই এ ব্যাপারে ভিন্ন একটি পন্থা অবলম্বন করেছে রাষ্ট্র।
সামরিক বাহিনীর মতোই প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত এক বাহিনী সৃষ্টি করেছে সরকার। বাহিনীটি সামরিকও নয় আবার বেসামরিকও নয়- আধা সামরিক!
আর এই আধা-সামরিক বাহিনীই হলো বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।বর্ডার গার্ড বা বিজিবির যাত্রা শুরু বহু বছর আগে সেই ব্রিটিশ আমলে।
১৭৯৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গড়ে তোলে 'ফ্রন্টিয়ার প্রটেকশন ফোর্স' নামক একটি বাহিনী। আর এই ফোর্সই বিভিন্ন সময়ে রূপ বদলে পুনর্গঠিত হয়ে আজকের এই বিজিবি।
'৪৭-এ দেশভাগের পর এই বাহিনীর নাম দেয়া হয় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস। ২৫ শে মার্চের কালরাত থেকে নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস রাখে অবিস্মরণীয় সব ভূমিকা।
তবে স্বাধীনতার পর ইপিআর বদলে যায় বিডিআর বা বাংলাদেশ রাইফেলস নামে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে এই বাহিনী স্বাধীনতা পুরস্কার পায়।
কিন্তু ঠিক তার পরের বছর, ২০০৯ সালে ন্যাক্কারজনক পিলখানা বিদ্রোহ ঘটে। আর এরপরই এই বাহিনী ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয় আওয়ামীলীগ সরকার।
আর তখনই বিডিআর বদলে নাম রাখা হলো বিজিবি! বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব মূলত এই বিজিবির হাতেই ন্যস্ত। চোরাচালান থেকে মাদক পাচার, শিশু পাচার কিংবা নারী পাচার- সীমান্তে ঘটা নানাবিধ অপরাধ রুখতে অতন্দ্র প্রহরীর কাজ করছে বিজিবি।
বর্তমানে বিজিবির মহাপরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন মেজর জেনারেল এ কে এম নাজমুল হাসান। যেহেতু এই বাহিনীও পদাতিক বাহিনীর মতোই, তাই কোনো সামরিক কর্মকর্তা ছাড়া এই বাহিনী পরিচালনা করা কঠিন।
আর তাই শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার দ্বারা পদাতিক বাহিনীর মতোই পরিচালিত হয়ে আসছেবিজিবি।
বিজিবিকে মূলত বাংলাদেশের 'ফার্স্ট লাইন অফ ডিফেন্স' বলা হয়। দেশে যদি কখনো বহিঃশত্রু আক্রমণ করে, তবে সে আঘাত প্রথম প্রতিরোধের দায়িত্ব এই বিজিবির ওপরই বর্তায়।
তবে এ ঘটনা কেবল শান্তিপূর্ণ সময়ে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সীমান্তে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিশ্বের কোনো দেশেই বিধিনিষেধ নেই।
গেল বছর সেপ্টেম্বরেই মায়ানমারের সঙ্গে এ বিষয়ে বিরোধ হয় বাংলাদেশের। রাখাইন রাজ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মায়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির লড়াই চলে কিছুদিন।
তখন সীমান্তে সেনা মোতায়েন বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করেনি দেশটি। আর এ কারণেই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে আতংক বিরাজ করছিলো।