জাতীয়


ভোট এলেই বাড়ত গুম: আওয়ামী লীগ আমলে ১৫ বছরে ১,৫৬৪টি গুম


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার

ভোট এলেই বাড়ত গুম: আওয়ামী লীগ আমলে ১৫ বছরে ১,৫৬৪টি গুম

ছবি: দূরবিন নিউজ


ভোট সামনে এলেই দেশে গুমের ঘটনা বাড়ত এমন চিত্র উঠে এসেছে গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নেতা কর্মীদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে গুম চালানো হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে দেশে গুমের ঘটনা ছিল ৬১টি। এর পরের বছর ২০১৩ সালে সেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায় ১২৮টিতে। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও গুমের ঘটনা বেড়ে যায়, যা পরবর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।

 

ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এই কমিশন চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীদের গণহারে আটক করা হতো এবং বেছে বেছে গুমের শিকার করা হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়,

আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে। আর ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়, যেখানে ভোটের আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ ওঠে। এই তিনটি নির্বাচনের আগেই গুমের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

 

ছবি: দূরবিন নিউজ


কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনা বাড়া কমার সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বড় সমাবেশ, বিক্ষোভ এবং নির্বাচনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৩ সালে গুমের ঘটনা বৃদ্ধির সঙ্গে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের যোগসূত্র পাওয়া যায়। একই প্রবণতা দেখা যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনকেও ঘিরে। ওই সময় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা–কর্মীরাই বেশি গুমের শিকার হন।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মোট ৯৪৮ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫৭ জন এখনো নিখোঁজ। গুমের শিকারদের মধ্যে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীদের সংখ্যা বেশি হলেও, গুমের পর ফিরে না আসা নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের। নিখোঁজদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও যুবদলের নেতা কর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মী।

 

কমিশন বলছে, গুম বোঝার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। এতে স্পষ্ট হয়, গুম কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত ঘটনা ছিল না; বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিরোধী মত দমনের কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়েছে।

 

 ছবি: দূরবিন নিউজ


২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে কমিশন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুম হয়েছে ২০১৬ সালে ২১৫টি। ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি এবং ২০১৫ সালে ১৪১টি গুমের ঘটনা ঘটে। তুলনামূলকভাবে ২০২০ ও ২০২১ সালে গুমের সংখ্যা কমলেও ২০২২ সালে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১১০টিতে। ২০২৪ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ৪৭।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের সংখ্যা ওঠানামা করেছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালে র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) পদ থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে সরানোর পর গুমের সংখ্যা কিছুটা কমে আসে। তবে কমিশনের মতে, এতে গুম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

 

২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‍্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর গুমের ঘটনায় সাময়িক ব্যাঘাত ঘটলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ দমন ও অপরাধ প্রতিরোধমূলক আটক আইনকে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

 

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তে গুমকে কৌশল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। এই চর্চা দীর্ঘ সময় ধরে চলায় গুম আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে একটি নিয়মিত দমনমূলক পদ্ধতিতে পরিণত হয়।


জনপ্রিয়


জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

সংসদে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ-২০২৬’ বিল পাস

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ-২০২৬’ বিল পাস হয়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে এই বিল অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংসদে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ ঘোষণার দাবি

জাতীয় সংসদে তারেক রহমান ও মরহুম আরাফাত রহমান কোকোকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে তাদের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বদলি বাণিজ্যে শতকোটি টাকার অভিযোগ: আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুদকে আবেদন

অবৈধ প্রক্রিয়ায় সাব-রেজিস্ট্রারদের ব্যাপক বদলির মাধ্যমে শতকোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও তার ব্যক্তিগত সহকারী মাসুমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে বাস্তবায়ন করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।