আওয়ামী লীগ ও এর ১৪ দলীয় জোটের বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যার অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চাওয়া হয়েছে। অভিযোগটি জমা দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। বুধবার (২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর এ অভিযোগ জমা দেন তিনি। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলের হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগসহ তাদের জোটের শরিকরা প্রত্যক্ষভাবে গণহত্যায় জড়িত ছিলেন।
এই অভিযোগের সাথে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম, এবং প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ এবং তাদের ১৪ দলের শরিকরা বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গণহত্যা সংগঠিত করেছে।
১৪ দলের শরিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দলগুলো হলো সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাসদ (ইনু), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), তরিকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র এবং জাতীয় পার্টি-জেপি। ববি হাজ্জাজের অভিযোগের ভিত্তিতে, এই দলগুলোর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং এসব অপরাধের বিচার দাবি করা হয়েছে।
ববি হাজ্জাজের দাখিল করা অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী দলগুলো সরাসরি হুকুমদাতা হিসেবে গণহত্যায় জড়িত। তাই, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক বিচার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই দলগুলো ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন করতে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষকে হত্যা, গুরুতর আহত এবং দমন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিগত সরকারের আদেশে পরিচালিত এসব হত্যা ও গণহত্যার শিকারদের জন্য বিচার দাবি করে বলা হয়েছে যে, এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
এর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানের চাপের মুখে পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে সংসদ ভেঙে দেয়া হয় এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে আছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলছে এবং এ সময় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে মামলা দায়ের হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন থানায় আন্দোলনকারীদের পক্ষে মামলা দাখিল করা হচ্ছে। এসব মামলায় আওয়ামী লীগ ও তাদের ১৪ দলীয় জোটের সদস্যদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও এসব অপরাধের বিচার চেয়ে অভিযোগ দাখিল হচ্ছে। ববি হাজ্জাজের নেতৃত্বে জমা দেওয়া এই অভিযোগটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাধারণত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন সহিংসতা এবং গণহত্যার বিচার দাবি করে যেসব অভিযোগ জমা পড়ছে, তার ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং সরকারের দমননীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হচ্ছে।
ববি হাজ্জাজের পক্ষ থেকে আনা এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে, ট্রাইব্যুনাল কিভাবে তদন্ত পরিচালনা করে এবং কী ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা নজরকাড়া হবে। এই অভিযোগটি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তৈরি করেছে এবং এতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
ববি হাজ্জাজ এবং তার দল এনডিএম আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছে। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সমর্থকরা এই বিচার প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানাচ্ছে এবং সরকারের সময়ে সংঘটিত সহিংসতার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, “আমরা যে কোনো প্রয়োজনে মানুষের পাশে থাকি এবং এই গণহত্যার বিচার হওয়া উচিত।”
এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে তা দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে। তবে এ বিচার প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এর ফলে কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে, তা সময়ের সঙ্গেই বোঝা যাবে।