সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এই অভিযোগে বিশেষভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমানকে। যদিও তিনি এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ‘ফেইক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই অভিযোগ নিয়ে দেশের ছাত্রসমাজ এবং নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য বিষয়টিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ, যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত, উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাবের মাঠে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই ইস্যু নিয়ে সরাসরি বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা রক্ত দিয়ে যাচ্ছি আর তারা সচিবালয়ে বসে টাকা ভাগ করছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের সাধারণ ছাত্র এবং নাগরিকেরা যখন আন্দোলন করছে এবং রক্ত দিচ্ছে, তখন দেশের নীতিনির্ধারকেরা সেই ত্যাগের মূল্যায়ন না করে নিজেদের স্বার্থের জন্য কোটি কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ এসময় স্লোগানের মাধ্যমেও প্রতিবাদ জানান, “দিয়েছি তো রক্ত, আরো দেব রক্ত। রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়।” তিনি আরও বলেন, “রাস্তায় শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়েছে, ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছে, আর এই বার্ধক্যের নেতৃত্ব সচিবালয়ে বসে আমাদের রক্ত মাড়িয়ে টাকা ভাগ করে। স্কাউন্ড্রেল...। এই বার্ধক্যের নেতৃত্বের জন্য আমরা (ছাত্র-নাগরিক) রক্ত দিতে প্রস্তুত না।” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
তাছাড়া, বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে তিনি সচিবালয়ের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, “আপনারা যারা সচিবালয়ে বসে নীতিনির্ধারণ করছেন, আপনাদের সচেতন হতে হবে। কারণ, ছাত্র-নাগরিক সমাজ আপনাদের দুর্নীতিপূর্ণ কর্মকাণ্ড সহ্য করবে না।” তার বক্তব্যে সরকারকে ইঙ্গিত করে বলা হয় যে, যেভাবে অতীতে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, তেমনভাবে সচিবালয়ের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ছাত্র-নাগরিক ৫ তারিখ যেভাবে হাসিনাকে তার মসনদ থেকে নামিয়েছে, আপনাদের সচিবালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ মিনিটের ডিসটেন্স।”
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “আপনারা সচিবালয়ে বসে ৫ কোটি না ১০ কোটি ভাগ করবেন, আর আমরা বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসটা কিনতে পারব না—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশের শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিভেদের দিকে আলোকপাত করেন।
প্রসঙ্গত, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ইতোমধ্যেই তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছে। এই তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে। তাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।
এ ঘটনায় দেশের শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সাধারণ জনগণকে ভোগাচ্ছে। একইসঙ্গে তারা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দাবি করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনও এই তদন্তের কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। তবে জনগণ আশা করছে, এই তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।