রাজনীতি
সংকট, নির্বাসন আর প্রত্যাবর্তন: যেভাবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হলেন তারেক রহমান
.webp)
সতেরো বছরেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ প্রবাস, মামলা–সংকট, রাজনৈতিক বিতর্ক আর অনিশ্চয়তার অধ্যায় পেরিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে তারেক রহমানের অবস্থান এখন দৃঢ় ও নির্ধারিত। বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে শুধু একজন নেতার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বিএনপির রাজনীতিতে এক দীর্ঘ সংকটেরও আপাত সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। দলটির দাবি ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ও আইনি বাধার কারণেই তার দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি। যদিও বাস্তবে তিনি দেশে ফিরছেন ওই সরকারের পতনের প্রায় পনেরো মাস পর। তবুও তার প্রত্যাবর্তন বিএনপির ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠা অনেকটাই প্রশমিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান নিজেই দেশে ফেরার বিষয়ে যে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—বিশেষ করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে তা দলের ভেতরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তার দেশে ফেরা বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর’ অনুভূতির মতো বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। মুক্তিযুদ্ধকালে পরিবারের সঙ্গে বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা তার শৈশব ও মানসিক গঠনে গভীর ছাপ ফেলে।
তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে, যখন তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হন। যদিও দলের ভেতরে অনেকের মতে, ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনেই তিনি সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং খালেদা জিয়ার নির্বাচনী কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল বিজয় অর্জন করে। সেই সময় হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে তার ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। পরে ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ সৃষ্টি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়, যা দলের ভেতরে তার রাজনৈতিক উত্থানের বড় ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন, কারাভোগ করেন এবং নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি লন্ডনে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় পান যা বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে ২০১৮ সালে।
লন্ডনে অবস্থানকালেও তিনি ধীরে ধীরে দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি দলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেন।
দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতা সংক্রান্ত একাধিক মামলায় দণ্ডিত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পান তারেক রহমান। এতে তার দেশে ফেরার পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ সংকটের মধ্যেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, তৃণমূলে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই তারেক রহমানের বড় রাজনৈতিক শক্তি। এখন প্রশ্ন একটাই এই অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে তিনি কি কেবল বিএনপির নয়, জাতীয় রাজনীতিরও কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে উঠতে পারবেন?
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিএনপি আগেই জানিয়েছে, এই নির্বাচনে দলটির নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান এবং তিনিই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন।
সংকট, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নেতৃত্বকে কেবল দলীয় গণ্ডিতে নয়, জাতীয় পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
বিএনপি জানালেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন কারা পাবেন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি জোটের মনোনয়ন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। এ অবস্থায় দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজপথে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেত্রীরাই মনোনয়নে অগ্রাধিকার পাবেন।

‘জামায়াতের দুঃখ আমির হামজা, এনসিপির দুঃখ নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী-এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

শফিকুর রহমান: ‘সংসদ মানুক বা না মানুক, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব’
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটের রায় অমান্য করা হলেও তারা গণভোটের ফল বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি সোমবার (৬ মার্চ) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা জানান।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে
আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে , বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি।


.jpg)





