রাজনীতি


এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাব না- খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থানের নেপথ্য কাহিনি


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার

এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাব না- খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থানের নেপথ্য কাহিনি

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শুরুর দিকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আছে, যেগুলো পরে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময়ের একেবারে ভেতরের গল্প উঠে এসেছে সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এম সাইফুর রহমানের আত্মজীবনী ‘কিছু স্মৃতি কিছু কথা’–তে। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন কীভাবে খালেদা জিয়া শুরু থেকেই এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।

 

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। তখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে। বিএনপির ভেতরে তীব্র মতভেদ দেখা দেয় একটি পক্ষ চেয়েছিল খালেদা জিয়াকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করতে, আরেকটি পক্ষ বিচারপতি সাত্তারকে। এম সাইফুর রহমান লিখেছেন, তিনি নিজে, তানভীর আহমদ সিদ্দিকীসহ অনেকেই খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তখন জেনারেল এরশাদের প্রভাব কাজ করছিল। ধারণা ছিল, খালেদা জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে শক্ত হাতে সবকিছু সামলাবেন এই আশঙ্কা থেকেই এরশাদ দুর্বল নেতৃত্বকেই এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

 

শেষ পর্যন্ত বিচারপতি সাত্তারই প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার কিছুদিনের মধ্যেই জেনারেল এরশাদ প্রকাশ্যে সামরিক বাহিনীর ‘অংশীদারত্বের’ কথা বলতে শুরু করেন। এতে দেশে-বিদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপরই ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ সরাসরি ক্ষমতা দখল করেন। সেই সময় এম সাইফুর রহমানসহ অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরই শুরু হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়। সাইফুর রহমান লিখেছেন, আসলে খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে নামতে তখন তাঁরাই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি নিজে রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না। ছিলেন একেবারে ঘরোয়া মানুষ, গৃহবধূ। কিন্তু দলের শূন্যতা, বিভক্তি আর এরশাদের কৌশল বুঝে তাঁকে সামনে আনতেই হয়।

 

Related posts here

 

খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সংগঠিত হতে থাকে, গড়ে ওঠে সাতদলীয় জোট। রাজপথে এরশাদবিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়। সেই সময় শেখ হাসিনা হঠাৎ করে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিলে আন্দোলনে বড় ধাক্কা আসে। অনেকেই ক্লান্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। এমন অবস্থায় এরশাদ বিএনপিকে প্রস্তাব দেন সিট ভাগাভাগি করে নির্বাচনে অংশ নিতে।

 

সেই জায়গায় এসে খালেদা জিয়া একেবারে পরিষ্কার কথা বলেন। এম সাইফুর রহমানের ভাষায়,

তিনি স্পষ্টভাবে বললেন- আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করছি। সেই এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাব না।

 

এমনকি বিএনপিকে ১২৬টি আসন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। দলের ভেতরে অনেকেই তখন নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন, এমনকি সাইফুর রহমান নিজেও শুরুতে সেই দিকেই ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া একচুলও নড়েননি।

 

এই আপসহীন অবস্থানই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিএনপি রাজপথে থাকে, আন্দোলন তীব্র হয়। ১৯৮৭–৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন ঘটে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, আর ১৯৯১ সালে সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

 

সাইফুর রহমান লিখেছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খালেদা জিয়া বক্তৃতা, নেতৃত্ব আর আত্মবিশ্বাসে বিস্ময়করভাবে পরিণত হন। একজন নীরব গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর স্মৃতিশক্তি, দৃঢ়তা আর সিদ্ধান্তে অনড় থাকার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করেছে।

 

এই লেখায় উঠে আসে একটাই স্পষ্ট ছবি খালেদা জিয়া আপসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। ক্ষমতার লোভ, সুবিধার প্রস্তাব বা চাপ কিছুই তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। এরশাদের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনমনীয়, আপসহীন নেত্রী হিসেবে স্থায়ী করে দিয়েছে।


সম্পর্কিত

এরশাদখালেদা জিয়া

জনপ্রিয়


রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিএনপি জানালেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন কারা পাবেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি জোটের মনোনয়ন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। এ অবস্থায় দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজপথে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেত্রীরাই মনোনয়নে অগ্রাধিকার পাবেন।

‘জামায়াতের দুঃখ আমির হামজা, এনসিপির দুঃখ নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী-এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

শফিকুর রহমান: ‘সংসদ মানুক বা না মানুক, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব’

বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটের রায় অমান্য করা হলেও তারা গণভোটের ফল বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি সোমবার (৬ মার্চ) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা জানান।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে

আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে , বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি।