রাজনীতি


টুপি-ঘোমটার রাজনীতি: পোশাক বদলেই কি সত্যিই বদলে যায় ভোটের হিসাব?


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার

টুপি-ঘোমটার রাজনীতি: পোশাক বদলেই কি সত্যিই বদলে যায় ভোটের হিসাব?

নির্বাচনী মাঠে এবার এক অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে টুপি, পাঞ্জাবি বা ঘোমটা পরলেই কি ভোট বাড়ে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে শুধু স্লোগান নয়, পোশাকও যেন হয়ে উঠেছে বড় এক কৌশল।

 

উদারপন্থি থেকে বামপন্থি, এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রায় সব ধারার রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেই এবার চোখে পড়ছে নির্বাচনী জনসংযোগে পোশাকের স্পষ্ট পরিবর্তন। পুরুষ প্রার্থীদের মাথায় টুপি ও গায়ে পাঞ্জাবি, আর নারী প্রার্থীদের ঘোমটা নির্বাচনী প্রচারণায় যেন এটি একটি অলিখিত ‘ড্রেস কোড’ হয়ে উঠেছে।

 

কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয় বিষয়টি। ধর্মীয় স্লোগান, পোস্টার, মাজার জিয়ারত কিংবা ধর্মীয় জমায়েতে উপস্থিত হয়ে ভোট চাওয়ার প্রবণতাও নতুন নয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশা ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিফলন এবারের নির্বাচনী জনসংযোগে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। বরং অভিযোগ উঠছে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে ভোটের রাজনীতিতে।

 

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও তার আগেই প্রার্থীদের নিজ নিজ আসনে জনসংযোগ করতে দেখা গেছে। এসব জনসংযোগের বড় অংশই হয়েছে মসজিদ, শোকসভা বা ধর্মীয় জমায়েতকেন্দ্রিক। সেখানে বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও ধর্মীয় পোশাকে দেখা গেছে।

 

এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ঢাকার এমপি প্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জনসংযোগের সময় একজন ব্যক্তি হঠাৎ তার ধর্মীয় পোশাক পরা নিয়ে প্রশ্ন তুললে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, যেহেতু বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং সমাজের প্রভাবশালী অংশ ধর্মচর্চার সঙ্গে যুক্ত, তাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগে একটি সাংস্কৃতিক মিল তৈরি হয়।

 

তবে ভোটারদের একটি বড় অংশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “এটা তো এক ধরনের ভণ্ডামি। লেবাস পরে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।” নোয়াখালীর এক ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, “নির্বাচনের সময় এই লেবাস, নির্বাচন শেষ হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।”

 

তবে কেউ কেউ মনে করেন, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিল থাকলে তা ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমি ব্যক্তি দেখে ভোট দেবো, কিন্তু গ্রামে অনেকেই ধর্মীয় ভাবধারার প্রার্থীকে গুরুত্ব দেয়।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় পোশাক ব্যবহারের পেছনে মূলত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করে একটি হলো পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করা, অন্যটি হলো ভোটারদের আবেগে স্পর্শ করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজার মতে, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব বা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে অনেক প্রার্থী ধর্মীয় লেবাস বেছে নেন।

 

ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭০, ১৯৯১ কিংবা ১৯৯৬ সালের নির্বাচন প্রতিটি পর্যায়েই ধর্মীয় স্লোগান ও প্রতীকের ব্যবহার দেখা গেছে। এমনকি বড় রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন সময় ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীককে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

 

তবুও প্রশ্ন থেকেই যায় ধর্ম ব্যবহার করে কি সত্যিই ভোট জেতা যায়? অনেক বিশ্লেষকের মতে, যদি তা-ই হতো, তাহলে ধর্মভিত্তিক দলগুলোই বারবার ক্ষমতায় আসত। বাস্তবে দেখা যায়, বড় দলগুলো মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের আস্থা পেতে ধর্মীয় আবরণ ব্যবহার করে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মের অপব্যবহার স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কোনো উপাসনালয়ে নির্বাচনী প্রচারণা, প্রার্থনারত ছবি ব্যবহার কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এই বিধি কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

 

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভোটারদের হাতেই। টুপি, ঘোমটা বা পাঞ্জাবির আড়ালে কে কী রাজনীতি করছে তা বোঝার দায়ও এখন ভোটারদের। কারণ ভোটের রায় পোশাকে নয়, হওয়া উচিত কাজ, নীতি ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিতে।

 

সম্পর্কিত

রাজনীতিভোটনির্বাচন

জনপ্রিয়


রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

নির্বাচনী সমঝোতা থেকে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠনের চিন্তায় এনসিপি

তরুণ নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গড়া নির্বাচনী জোটকে রাজনৈতিক জোটে রূপান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করছে। যদিও শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেননি, তবে দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংস্কার ইস্যুতে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জামায়াত আমিরের পোস্ট: কী লিখলেন ডা. শফিকুর রহমান?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এবার এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

আমার কিছু হলে এর দায় ভরসা ও বিএনপিকে নিতে হবে: আখতার হোসেন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজ নির্বাচনী এলাকা রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া) আসনের হারাগাছে প্রথম সফরে যাচ্ছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তার এই সফরকে ঘিরে হারাগাছে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে পৌর বিএনপি। এতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি থেকে এগিয়ে যারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ আসনে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভাগে ৫০টির মধ্যে ৩৭টি সংরক্ষিত নারী আসন আসতে পারে। নির্বাচন কমিশন রমজান মাসের মধ্যেই এ নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে।