রাজনীতি
পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার ঘোষণা, তবু লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে নির্বাচনী শঙ্কা কুষ্টিয়ায়

ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলার চারটি সংসদীয় আসনের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে আধুনিক নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে, যাতে ভোটগ্রহণের দিন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা অনিয়মের সুযোগ না থাকে। তবে পুলিশের এই কঠোর প্রস্তুতির মাঝেও থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার চারটি আসনে মোট ৫৯৯টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের প্রতিটিতেই সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের একটি বড় অংশ বডি–অন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন। এর ফলে কেন্দ্রের ভেতর ও বাইরের পরিস্থিতি সরাসরি কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভোটের দিন কোনো কেন্দ্রেই পরিবেশ নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হবে না। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা এলাকা এবং চরবেষ্টিত দুর্গম ইউনিয়নগুলোকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি বিশেষ টিম ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরসহ দীর্ঘ ভারতীয় সীমান্তজুড়ে চারটি স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে, যাতে সীমান্ত দিয়ে কোনো অস্ত্র, গোলাবারুদ বা সন্ত্রাসী নির্বাচনী এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে। সীমান্তবর্তী এলাকার ৫১টি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও বিজিবির সমন্বিত টহল এবং বাড়তি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চিহ্নিত অপরাধী ও চরমপন্থীদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পুলিশ জানিয়েছে, অস্ত্রধারী বা সহিংসতায় জড়িতদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সম্প্রতি একজন চরমপন্থীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দুর্গম চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত চর সাদিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রকে ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। ওই ইউনিয়নের পাঁচটি কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে পুলিশের বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করবে, যারা যেকোনো ধরনের নাশকতা, সহিংসতা বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করবে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। নির্বাচনে সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ ব্যক্তিদের আগেই চিহ্নিত করে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কেউ ভোটের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ এবং মাঠে থাকা পুলিশ সদস্যদের বডি–অন ক্যামেরার লাইভ চিত্র কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও সহিংসতার আভাস বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দেখা দিলে নিকটবর্তী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
তবে পুলিশের এসব প্রস্তুতির মাঝেও রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়ে গেছে। তাঁদের দাবি, থানা থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের ঝুঁকি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এসব অস্ত্র নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তাঁরা।
বিশেষ করে আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়া মডেল থানা থেকে লুট হওয়া ১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে করছেন প্রার্থী ও সাধারণ ভোটাররা।
জেলা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া মডেল থানা থেকে মোট ৫৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অভিযানে ৩৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ১৭টি অস্ত্রের কোনো সন্ধান মেলেনি। লুট হওয়া গুলির সঠিক হিসাবও পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।
নিখোঁজ থাকা অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কুষ্টিয়া–৩ (সদর) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুফতি আমির হামজা। তিনি বলেন, লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহার করে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করা হতে পারে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে দ্রুত এসব অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান তিনি।
নিরাপত্তা ইস্যুতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও শঙ্কা কাজ করলেও জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে তারা। পাশাপাশি বিজিবি জানিয়েছে, নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ রাখতে সীমান্ত এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি ও কঠোর টহল ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
‘জামায়াতের দুঃখ আমির হামজা, এনসিপির দুঃখ নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী-এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

শফিকুর রহমান: ‘সংসদ মানুক বা না মানুক, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব’
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটের রায় অমান্য করা হলেও তারা গণভোটের ফল বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি সোমবার (৬ মার্চ) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা জানান।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে
আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে , বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি।

তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক, নির্বাচনের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা
নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম বৈঠকে বসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শনিবার (৪ এপ্রিল) রাত ৮টার কিছু আগে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে শুরু হয়।


.jpg)






