প্রযুক্তি


আউটসোর্সিং নয়, এবার গ্লোবাল এন্টারপ্রাইজ এআই কোম্পানি গড়ছে বাংলাদেশের বেটোপিয়া


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:১১ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার

আউটসোর্সিং নয়, এবার গ্লোবাল এন্টারপ্রাইজ এআই কোম্পানি গড়ছে বাংলাদেশের বেটোপিয়া

গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ পরিচিত ছিল একটি আউটসোর্সিং গন্তব্য হিসেবে। কিন্তু মুহাম্মদ মনির হোসেনের বিশ্বাস, দেশের পরবর্তী অধ্যায় হবে একেবারে ভিন্ন, আউটসোর্সিং নয় বরং বিশ্বমানের এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি কোম্পানি গড়ে তোলা, যেগুলো উদ্ভাবন, সক্ষমতা আর স্কেলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এই ভাবনাকেই বাস্তব রূপ দেওয়ার চেষ্টা তার প্রতিষ্ঠিত বেটোপিয়া গ্রুপ।

২০২৫ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে বেটোপিয়া গ্রুপ, যেখানে একসঙ্গে যুক্ত হয় বাইশটি কোম্পানি, পাঁচ হাজারের বেশি পেশাজীবী এবং আশিটি দেশজুড়ে বিস্তৃত কার্যক্রম। বর্তমানে গ্রুপের বার্ষিক আয় ৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় চার হাজার তিনশ কোটি টাকা, আর মাসিক বেতন বাবদ ব্যয় হয় আশি কোটি টাকার বেশি। কর্মী সংখ্যার হিসাবে বেটোপিয়া এখন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

মনির হোসেনের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল কোনো বোর্ডরুমে নয়, বরং একটি ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে। ওডেস্ক এবং পরে ইল্যান্স-এ একাই ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ করতেন তিনি, প্রকল্প ধরে ধরে গড়ে তুলেছিলেন নিজের পরিচিতি। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দল গঠন করেন, ধীরে ধীরে তৈরি করেন এমন একটি কাঠামো যা একক ফ্রিল্যান্সিংয়ের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না।

২০১৭ সালে এই ভিত্তি রূপ নেয় আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়। পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ আর সাতজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বিডিক্যালিং আইটির, যার লক্ষ্য ছিল প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের উচ্চমানের প্রযুক্তি সেবা দেওয়া। পরের আট বছর ধাপে ধাপে বিস্তার ঘটে, একটি বিশ্বাসের ওপর ভর করে যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কম খরচের শ্রম নয়, বরং সঠিক অবকাঠামো ও নেতৃত্ব পেলে বিশ্বমানের ফল দিতে সক্ষম প্রকৌশল প্রতিভা।

বেটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, তাদের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি কর্মীরাই। তিনি জানান, লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে এমন প্রযুক্তি গড়ে তোলা যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে দেশের তরুণ পেশাজীবীদের জন্য টেকসই ও মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি করে।

বেটোপিয়াকে শুধু একটি সফটওয়্যার কোম্পানি বললে ভুল হবে। বেশিরভাগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করে, কেউ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে, কেউ হার্ডওয়্যার সরবরাহে, কেউবা ব্যবস্থাপনা পরামর্শে। যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ এন্টারপ্রাইজ রূপান্তর প্রয়োজন হয়, তাদের একাধিক ভেন্ডরের সঙ্গে কাজ করতে হয়, যার ফলে দায়বদ্ধতায় বিভাজন তৈরি হয়, সময়সূচি মেলে না, আর প্রকল্প প্রায়ই এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে হস্তান্তরের সময় আটকে যায়। এই সমস্যা দূর করার লক্ষ্যেই বেটোপিয়ার নকশা করা হয়েছে। এই গ্রুপ একই প্ল্যাটফর্মের মধ্য দিয়ে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার আর কৌশলগত পরামর্শ, সবকিছু একসঙ্গে সরবরাহ করে। গ্রাহকদের একাধিক ভেন্ডরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয় না, সিস্টেম আর্কিটেকচার নকশা থেকে শুরু করে অবকাঠামো স্থাপন, সফটওয়্যার তৈরি ও চালু করা, এমনকি পরিচালন পরামর্শ পর্যন্ত সবকিছুর দায়িত্ব থাকে একটি জায়গাতেই।

উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের সেবার জন্য মোটা অঙ্কের মূল্য নেয়। বেটোপিয়া বাংলাদেশ থেকে এই একই মানের সেবা এন্টারপ্রাইজ গ্রেডে আশিটি দেশের গ্রাহকদের দিয়ে থাকে।

গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বেটোপিয়া লিমিটেড আন্তর্জাতিক বাজার উন্নয়ন ও এন্টারপ্রাইজ সমাধানের নেতৃত্ব দেয়, যা বাংলাদেশে ওডু-র (Odoo) অফিশিয়াল সিলভার পার্টনার হিসেবে কাজ করে। এছাড়া মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, গুগল ক্লাউড, ডেল, সিসকো, এইচপিই, ফোর্টিনেট, ওরাকল ও রেড হ্যাটের সঙ্গে যাচাইকৃত প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব রয়েছে তাদের, যা শুধু বাণিজ্যিক সংযোগ নয় বরং বাস্তব বাস্তবায়ন সক্ষমতারও প্রমাণ।

বেটোপিয়ার সক্ষমতার একটি বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনাসদস্যদের সেবার জন্য তৈরি করা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভিএলএআরপ্রো। মার্কিন প্রবীণ সেনাসদস্যরা প্রতিবন্ধকতাজনিত সুবিধার আবেদন প্রক্রিয়ায় এত বেশি কাগজপত্র আর জটিলতার মুখোমুখি হন যে অনেকেই আবেদন শেষ করার আগেই হাল ছেড়ে দেন। বেটোপিয়া এই সমস্যার সমাধানে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করে, যার মধ্যে রয়েছে মোবাইল অ্যাপ, ওয়েব পোর্টাল, পুরো দাবি প্রক্রিয়ার কর্মপ্রবাহ এবং নিরাপদ নথি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম। এর ফলে সারা যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো প্রযুক্তিগত পটভূমির প্রবীণ সেনাসদস্যদের জন্যও এই জটিল প্রক্রিয়া সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কৌশলগত ভাবনার বিষয় নয়, বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি এখন কার্যক্ষম প্রয়োজনীয়তা। এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে এআই গড়ে তুলতে দরকার হয় শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর, জিপিইউ ক্লাস্টার, নিরাপদ ক্লাউড পরিবেশ আর নির্ভরযোগ্য ডেটা কাঠামো। এন্টারপ্রাইজ এআই মূলধারায় আসার অনেক আগেই বেটোপিয়া এই ধরনের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে। এনভিডিয়া-চালিত সিস্টেমে বাংলাদেশেই এখন এআই মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ ও স্থাপনের কাজ চলছে তাদের।

মনির হোসেন বলেন, তার প্রকৌশলীরা যখন বলেন তারা এআই অবকাঠামো তৈরি করেছেন, তখন সেটা প্রকৃত অর্থেই তৈরি করা, শুধু আলোচনার সক্ষমতা অর্জন নয় বরং বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন।

বাংলাদেশকে এআই অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে হোসেন তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, বিশ্বমানের এআই অবকাঠামো, যেখানে এআই হার্ডওয়্যারের উচ্চ আমদানি শুল্ক, দীর্ঘ শুল্ক প্রক্রিয়া, অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ আর উচ্চ আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ খরচ উদ্ভাবনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ, যেখানে ক্লাউড সেবা, সফটওয়্যার লাইসেন্স ও এআই প্ল্যাটফর্মের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রবেশাধিকার এখনো অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমাবদ্ধ। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষ জনবল, যেখানে বাংলাদেশ প্রতিবছর হাজার হাজার সফটওয়্যার প্রকৌশলী তৈরি করলেও বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত সরে যাচ্ছে এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্লাউড আর্কিটেকচার, সাইবার নিরাপত্তা আর ডেটা সায়েন্সের দিকে।

হোসেনের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন আরও বড়, বেটোপিয়া সিটি নামে একটি প্রযুক্তিকেন্দ্রিক নগর গড়ে তোলা, যেখানে একই জায়গায় থাকবে বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার, বাণিজ্যিক ভবন, করপোরেট সদর দপ্তর, উদ্ভাবন কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর আবাসিক সুবিধা। তার ভাষায়, তিনি এমন কিছু গড়তে চান যা শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় দেবে না, বরং নতুন প্রতিষ্ঠান জন্ম দেবে। ২০৩০ সালের মধ্যে হাজার হাজার বাংলাদেশি পেশাজীবীর জন্য কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করাই তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য।

বৈশ্বিক এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি সেবা ও ডিজিটাল রূপান্তরের বাজার ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাবে পরিমাপ করা হয়, যার একটি ক্ষুদ্র অংশই এখন বাংলাদেশের দখলে। বেটোপিয়ার দাবি, প্রকল্পভিত্তিক আউটসোর্সিং থেকে বেরিয়ে উচ্চমূল্যের সম্পর্কভিত্তিক কাজে প্রবেশ করলে এই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

 

জনপ্রিয়


প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন

অবশেষে Gmail অ্যাড্রেস পরিবর্তনের সুবিধা আনছে Google, থাকবে আগের সব ডেটা

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর Gmail অ্যাড্রেস পরিবর্তনের সুবিধা আনছে Google। নতুন ফিচারের মাধ্যমে একই Google অ্যাকাউন্টে Gmail অ্যাড্রেস বদলানো গেলেও ইমেইল, Google Drive, Photos, YouTube ও অন্যান্য সব ডেটা আগের মতোই অক্ষত থাকবে। বর্তমানে সুবিধাটি ধাপে ধাপে ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের আবহে সাংবাদিকদের নিয়ে ‘টেকনো ফুটবল নাইট’ আয়োজন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনাকে ঘিরে রাজধানীর গুলশানে সাংবাদিকদের সম্মানে ‘টেকনো ফুটবল নাইট’ আয়োজন করেছে স্মার্টফোন ব্র্যান্ড টেকনো। অনুষ্ঠানে টেকনো বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জুলাইয়ে টেকনোর দাম কমায় বদলাচ্ছে স্মার্টফোন বাজার

বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর ও মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে স্মার্টফোন বাজারে বাড়ছে  খরচ, বাড়ছে দামের চাপ। যার ফলে অনেক দেশে বাড়ছে স্মার্টফোনের দাম।

স্মার্ট টেকনোলজিসের এমডির বিরুদ্ধে বিদেশে গোপন কোম্পানি ও অর্থপাচারের অভিযোগ

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে দেশের প্রযুক্তিপণ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম ও তার ভাই মাঝহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও সেখান থেকে অর্জিত আয়ের কোনো তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথিতে নেই।