বাংলাদেশ
আউটসোর্সিং থেকে বৈশ্বিক এআই নেতৃত্বে: বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলতে বেটোপিয়া গ্রুপের নতুন যাত্রা

এক সময় বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের পরিচয় ছিল মূলত আউটসোর্সিংনির্ভর দেশ হিসেবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কিংবা আইটি সেবা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরি করেছে দেশের হাজারো তরুণ। তবে প্রযুক্তি শিল্পের দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি শুধু সেবা দানকারী দেশ হয়েই থাকবে, নাকি নিজস্ব প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং এন্টারপ্রাইজ সমাধান নিয়ে বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নতুন যাত্রা শুরু করেছে বেটোপিয়া গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের আগামী অধ্যায় আউটসোর্সিং নয়; বরং বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যারা উদ্ভাবন, দক্ষতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করবে।
সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বেটোপিয়া গ্রুপ। একটি হোল্ডিং কোম্পানির অধীনে ২২টি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে গঠিত এই গ্রুপ বর্তমানে ৮০টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রযুক্তিপেশাজীবী এখানে কর্মরত, যা কর্মীসংখ্যার দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি নিয়োগদাতায় পরিণত করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বেটোপিয়ার বার্ষিক আয় বর্তমানে ৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা। শুধু বেতন-ভাতার পেছনেই প্রতি মাসে ব্যয় হয় ৮ কোটি টাকারও বেশি।
বেটোপিয়ার এই যাত্রাকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখছেন এর প্রতিষ্ঠাতা। তার মতে, বিশ্ববাজারে এখন আর শুধু আউটসোর্সিং সেবার চাহিদা বাড়ছে না; বরং দ্রুত বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল রূপান্তর সেবার চাহিদা। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ভর করবে দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে কি না, তার ওপর।
মুহাম্মদ মনির হোসেনের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প শুরু হয় কোনো করপোরেট অফিস বা বিনিয়োগকারীর সহায়তায় নয়; বরং আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম oDesk (বর্তমানে Upwork) এবং Elance-এ একজন স্বাধীন ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে।
শুরুর দিকে বিদেশি গ্রাহকদের ছোট ছোট ওয়েব ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প নিয়ে একাই কাজ করতেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কাজের পরিধি ও গ্রাহকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, এককভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তে থাকা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তখনই তিনি একটি দল গঠন করেন এবং ধীরে ধীরে এমন একটি কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করেন, যা ব্যক্তিনির্ভর ফ্রিল্যান্সিংয়ের সীমা অতিক্রম করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।
এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ২০১৭ সালে মাত্র ৫ লাখ টাকা প্রাথমিক মূলধন এবং সাতজন কর্মী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বিডিকলিং আইটি (Bdcalling IT)। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বাজারের গ্রাহকদের জন্য উচ্চমানের প্রযুক্তি সমাধান তৈরি করা। পরবর্তী আট বছরে ধাপে ধাপে নতুন নতুন সেবা, প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ছোট একটি আইটি প্রতিষ্ঠান আজকের বেটোপিয়া গ্রুপে পরিণত হয়েছে।
মুহাম্মদ মনির হোসেনের বিশ্বাস, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কম খরচে শ্রম সরবরাহ নয়; বরং দেশের দক্ষ প্রকৌশলীরা। যথাযথ অবকাঠামো, নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মানের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাও বিশ্বমানের প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম।
"আমাদের কর্মীরাই আমাদের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। আমরা বাংলাদেশে এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চাই, যা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করবে এবং একই সঙ্গে দেশের তরুণ পেশাজীবীদের জন্য টেকসই ও উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।"প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বেটোপিয়া গ্রুপ
বেটোপিয়ার যাত্রা সেই বিশ্বাস থেকেই। প্রতিষ্ঠানের দাবি, তারা শুধু প্রযুক্তি সেবা রপ্তানি করতে চায় না; বরং বাংলাদেশে তৈরি প্রযুক্তিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে চায়। তাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশকে শুধু আউটসোর্সিংয়ের দেশ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট একটি সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কেউ সফটওয়্যার তৈরি করে, কেউ হার্ডওয়্যার সরবরাহ করে, আবার কেউ প্রযুক্তি পরামর্শ দেয়। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের প্রয়োজন হলে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এতে সমন্বয়হীনতা, সময়ক্ষেপণ এবং দায়বদ্ধতার জটিলতা তৈরি হয়।
বেটোপিয়া গ্রুপের দাবি, তারা এই প্রচলিত মডেল থেকে বেরিয়ে এসে একটি সমন্বিত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি একই ছাতার নিচে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং কৌশলগত পরামর্শ সেবা প্রদান করে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো গ্রাহককে আলাদা আলাদা বিক্রেতার সঙ্গে কাজ করতে হয় না। অবকাঠামো পরিকল্পনা, সার্ভার ও নেটওয়ার্ক স্থাপন, সফটওয়্যার উন্নয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী প্রযুক্তিগত সহায়তা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্ব বেটোপিয়াই গ্রহণ করে।
তাদের দাবি, উন্নত দেশগুলোর বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে সমন্বিত এন্টারপ্রাইজ সেবা দিয়ে থাকে, বাংলাদেশ থেকেই সেই ধরনের সেবা আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে বেটোপিয়া।বেটোপিয়া গ্রুপের প্রধান প্রতিষ্ঠান বেটোপিয়া লিমিটেড আন্তর্জাতিক বাজারে এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি সমাধান এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশের অফিশিয়াল Odoo Silver Partner হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি রিসেলার, আঞ্চলিক কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান এবং সিস্টেম ইন্টিগ্রেটরদের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ পার্টনার প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে, যার মাধ্যমে তারা বেটোপিয়ার প্রযুক্তি সমাধান বাজারজাত করতে পারে।
এছাড়া বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Microsoft, Amazon Web Services (AWS), Google Cloud, Dell Technologies, Cisco, Hewlett Packard Enterprise (HPE), Fortinet, Oracle এবং Red Hat-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছে বেটোপিয়া।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব অংশীদারিত্ব শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতার স্বীকৃতি। বেটোপিয়ার আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম VLARPRO। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের (ভেটেরান) জন্য তৈরি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্সে প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত সুবিধার আবেদন করতে গিয়ে অনেক ভেটেরান জটিল কাগজপত্র, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আবেদন সম্পন্ন করতে পারেন না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বেটোপিয়া একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। প্রকল্পটির আওতায় রয়েছে একটি মোবাইল অ্যাপ, ওয়েব পোর্টাল, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্লেইমস ওয়ার্কফ্লো এবং নিরাপদ ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এর ফলে বহু ভেটেরানের জন্য দীর্ঘদিনের জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে এবং তারা প্রযুক্তিগত দক্ষতা না থাকলেও সহজে আবেদন সম্পন্ন করতে পারছেন। বেটোপিয়ার মতে, তাদের কাজের মূল লক্ষ্য শুধু সফটওয়্যার তৈরি করা নয়; বরং বাস্তব সমস্যার কার্যকর প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা। বর্তমানে তারা LegalTech, FinTech, EdTech, Healthcare, Manufacturing এবং Supply Chain Management-সহ বিভিন্ন খাতে এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি সমাধান নিয়ে কাজ করছে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। তবে বেটোপিয়ার মতে, শুধু এআই নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; এর জন্য প্রয়োজন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো। এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য দরকার জিপিইউভিত্তিক সার্ভার, শক্তিশালী প্রসেসর, নিরাপদ ক্লাউড পরিবেশ এবং নির্ভরযোগ্য ডেটা অবকাঠামো।
বেটোপিয়া জানিয়েছে, এআই জনপ্রিয় হওয়ার আগেই তারা বাংলাদেশে GPU-চালিত কম্পিউটিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ শুরু করে। বর্তমানে তাদের প্রকৌশলীরা NVIDIA-ভিত্তিক অবকাঠামো ব্যবহার করে মেশিন লার্নিং, এন্টারপ্রাইজ অটোমেশন এবং বিভিন্ন এআই মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়নের কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই অবকাঠামো শুধু নিজেদের প্রকল্পেই নয়, আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্যও এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড এআই সমাধান তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
"আমাদের প্রকৌশলীরা যখন বলেন যে তারা এআই অবকাঠামো তৈরি করেছেন, তখন সেটি বাস্তব। আমরা শুধু এআই নিয়ে কথা বলার সক্ষমতা অর্জন করিনি, বরং তা বাস্তবে নির্মাণ ও সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি করেছি।"
প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বেটোপিয়া গ্রুপ
তার মতে, আগামী দশকে প্রযুক্তি বাজারে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দেবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা শুধু এআই নিয়ে পরামর্শ দেবে না, বরং বাস্তবে বৃহৎ পরিসরে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
বাংলাদেশ থেকে ৮০টি দেশে প্রযুক্তি সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে মুহাম্মদ মনির হোসেন মনে করেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো মেধাবী প্রকৌশলীর অভাব দেশে নেই। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হতে হলে প্রযুক্তি খাতের জন্য আরও আধুনিক নীতিমালা ও অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
তার মতে, বাংলাদেশ আঞ্চলিক এআই ও প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দিতে চাইলে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশ্বমানের এআই অবকাঠামো নির্মাণ
মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য শুধু দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী থাকলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো, জিপিইউ ক্লাস্টার, নির্ভরযোগ্য ডেটা সেন্টার এবং নিরাপদ ক্লাউড পরিবেশ।
তার মতে, বর্তমানে এআই হার্ডওয়্যার আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের উচ্চ ব্যয় প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যখন এআই অবকাঠামো নির্মাণে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশকেও ডেটা সেন্টার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং এবং এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
মনির হোসেনের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সীমান্তহীন বৈশ্বিক বাজারে কাজ করলেও দেশের অনেক নিয়মকানুন এখনো প্রচলিত শিল্পখাতকে কেন্দ্র করেই তৈরি। তিনি বলেন, ক্লাউড সেবা, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার, এআই প্ল্যাটফর্ম কিংবা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সেবা কেনার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারে বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে। তার মতে, প্রযুক্তি রপ্তানিকারকদের জন্য সহজ, দ্রুত এবং আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগও বাড়বে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবছর হাজার হাজার সফটওয়্যার প্রকৌশলী তৈরি করলেও বিশ্ববাজারের চাহিদা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড আর্কিটেকচার, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা সায়েন্সে দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই ব্যবধান কমাতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি শিল্পকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং শিল্প-একাডেমিয়ার সমন্বয় ছাড়া বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব নয়।
"বেসরকারি খাত ইতোমধ্যে দেখিয়েছে কী সম্ভব। আমরা প্রতিষ্ঠান গড়েছি, প্রকৌশলী তৈরি করেছি এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেছি। এখন উদ্ভাবনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই পরবর্তী ধাপ। যদি আজই বিশ্বমানের অবকাঠামো, আধুনিক নীতিমালা এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষ জনবলে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ এআই ও প্রযুক্তি অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।"
প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বেটোপিয়া গ্রুপ
বর্তমান ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বাইরে আরও বড় একটি স্বপ্ন দেখছেন মুহাম্মদ মনির হোসেন। তিনি 'বেটোপিয়া সিটি' নামে একটি প্রযুক্তিনির্ভর নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তার কল্পনায়, এই নগরীতে থাকবে বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার, করপোরেট সদর দপ্তর, প্রযুক্তি পার্ক, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক সুবিধা। তার লক্ষ্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রকৌশলী ও বিনিয়োগকারীরা একই স্থানে কাজ করবেন এবং একে অপরের উদ্ভাবনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
"আমি এমন কিছু তৈরি করতে চাই, যা শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য অফিস হবে না; বরং নতুন প্রযুক্তি কোম্পানির জন্ম দেবে। এমন একটি জায়গা, যেখানে অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং উদ্ভাবনের সংস্কৃতি একই সঙ্গে থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ এমন একটি উদ্যোগের যোগ্য।"
প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বেটোপিয়া গ্রুপ
২০৩০ সালের লক্ষ্য
বেটোপিয়া গ্রুপের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কয়েক হাজার নয়, কয়েক দশ হাজার প্রযুক্তিপেশাজীবীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নয়, বরং বেটোপিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
বেটোপিয়ার মতে, এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল রূপান্তর সেবার বৈশ্বিক বাজারের আকার ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো সেই বাজারের খুব সামান্য অংশ দখল করতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব, যদি দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পভিত্তিক আউটসোর্সিংয়ের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক করপোরেট গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি সমাধান তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, এই পরিবর্তনের জন্য স্বল্পমেয়াদি আয়ের চিন্তার পরিবর্তে আগাম বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রতিযোগিতা করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।
"আমাদের লক্ষ্য এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যা বাংলাদেশের মাটিতে উদ্ভাবিত হবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হবে। আমরা বিশ্বাস করি, বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মতো মেধা বাংলাদেশের রয়েছে। এখন প্রশ্ন এটি সম্ভব কি না, সেটি নয়; বরং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব কি না।"
প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বেটোপিয়া গ্রুপ
বর্তমানে ঢাকায় সদর দপ্তর থাকা বেটোপিয়া গ্রুপের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলেও বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাস, বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তি সেবা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, ভবিষ্যতে বিশ্বমানের এন্টারপ্রাইজ এআই ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
বাংলাদেশজুড়ে ফ্লেক্সিবল ডেলিভারি সেবা চালু করল পাঠাও পার্সেল
দেশের অন্যতম শীর্ষ সুপার অ্যাপ পাঠাও তাদের পার্সেল সেবার পরিধি আরও সম্প্রসারণ করেছে। গ্রাহকদের প্রয়োজন, সময় ও বাজেট বিবেচনায় আরও দ্রুত, নমনীয় এবং সাশ্রয়ী ডেলিভারি নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক নতুন ডেলিভারি অপশন চালু করেছে।

ইইউবিতে বোর্ড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস গঠন, বিওটি ভেঙে দেওয়ার প্রচারণা গুজব: কর্তৃপক্ষ
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (ইইউবি) শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ধারা ৩৫(৭) অনুযায়ী একটি বোর্ড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস গঠন করেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

তরুণদের ক্যারিয়ার গঠনে মেন্টরিংয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন রফিকুল ইসলাম মাহিম
নিজের পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তরুণ ও বেকার যুবকদের ক্যারিয়ার গঠন এবং মানসিক সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তা ও মেন্টর রফিকুল ইসলাম মাহিম। ‘নিজে যতটুকু জানি, ততটুকু দিয়েই অন্যের উপকার করা উচিত’ এই বিশ্বাসকে ধারণ করে দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের জন্য গাইডলাইন, কাউন্সেলিং ও মেন্টরিং সেবা দিয়ে আসছেন ‘জব ইনফরমেশন বিডি’ (Job Information BD)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বিদেশে তিন কোম্পানি গঠনের অভিযোগ, এক বছরেও এগোয়নি জহিরুলের অর্থপাচার অনুসন্ধান
সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই অন্তত তিনটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অভিযোগে স্মার্ট টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম ও তার ভাই মাঝহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় এক বছর আগে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অনুসন্ধান শুরুর এক বছর পার হলেও মামলার তদন্তে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।








