সারাদেশ


ভোলা হাসপাতালে শিশু বিভাগে এক চিকিৎসকের ওপর চাপ, সেবা নিয়ে রোগীদের অভিযোগ


জেলা প্রতিনিধি

জেলা প্রতিনিধি

প্রকাশিত:০২ জুন ২০২৬, ১২:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার

ভোলা হাসপাতালে শিশু বিভাগে এক চিকিৎসকের ওপর চাপ, সেবা নিয়ে রোগীদের অভিযোগ

ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বহির্বিভাগ, ভর্তি রোগী এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা কার্যত একজন চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় সেবা নিয়ে ক্ষোভ ও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

 

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, শিশু ওয়ার্ডে নিয়মিত চিকিৎসকের উপস্থিতি না থাকায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানির সংকট এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

 

ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর এলাকার বাসিন্দা মুক্তা বেগম জানান, হামে আক্রান্ত তাঁর নয় মাস বয়সী সন্তান তাহসিফকে গত ২৬ মে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে ভর্তি হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসকের সেবা না পাওয়ায় বাইরে থেকেও চিকিৎসা পরামর্শ নিতে হয়েছে।

 

একই অভিযোগ করেন ভোলার ওয়েস্টার্নপাড়া এলাকার মো. হাসান। তিনি বলেন, ঈদের আগে অসুস্থ সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করালেও কয়েক দিনে মাত্র একবার চিকিৎসকের দেখা পেয়েছেন। তাঁর দাবি, শিশু ওয়ার্ডের অনেক রোগীর স্বজন একই ধরনের সমস্যার কথা বলছেন।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ থাকলেও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থায় রয়েছে নানা ঘাটতি। বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা এবং দুর্গন্ধের উপস্থিতি চোখে পড়ে। বিশেষ করে টয়লেটগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।

 

ভেদুরিয়া টেকেরহাট এলাকার বাসিন্দা নয়নতারা বলেন, হাম ওয়ার্ডের টয়লেট নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলে দুর্গন্ধের কারণে রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

 

এ ছাড়া নিরাপদ খাবার পানির সংকটের অভিযোগও রয়েছে। বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকার মাহামুদুল্লাহ রিয়াদ বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বাইরে থেকে পানি কিনে আনছেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল অনেক রোগী ও স্বজন বাধ্য হয়ে ট্যাপের পানি ব্যবহার করছেন।

 

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। একটি শয্যায় চার থেকে পাঁচজন শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অনেক রোগীকে বারান্দা, মেঝে ও সিঁড়িতেও রাখা হয়েছে। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্বজনরা।

 

এ ছাড়া ওয়ার্ডের কিছু ফ্যান বিকল এবং কিছু ধীরগতিতে চলায় রোগী ও স্বজনদের ভ্যাপসা গরমে কষ্ট করতে দেখা গেছে। অনেককে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায়।

 

হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগী মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ শিশুকে চিকিৎসাসেবা দিতে হয়। একই সঙ্গে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, “একজন চিকিৎসকের পক্ষে এত বিপুল সংখ্যক রোগীর সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।” রোগীদের সচেতনতার ওপরও গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অসুস্থ শিশুর সঙ্গে অনেক সময় পরিবারের সুস্থ শিশুরাও হাসপাতালে অবস্থান করে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আরাফাতুর রহমান জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

 

তিনি বলেন, “২৫ শয্যার শিশু ইউনিটে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। ফলে একেকটি বেডে চার থেকে পাঁচজন শিশুকে রাখতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা অত্যন্ত চাপের মধ্যে কাজ করছেন।”

 

আরএমও জানান, জনবল সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।

 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল কাঠামো এখনো ১০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় সাত বছর ধরে নতুন জনবল নিয়োগ না হওয়ায় চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ বাড়ছে।

 

সিভিল সার্জন কার্যালয় ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাসহ মোট ১৭৯টি পদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে সিনিয়র কনসালট্যান্ট, জুনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অফিসার, অ্যানেসথেটিস্ট, রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে।

 

রোগী ও স্বজনদের দাবি, শিশু বিভাগে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় স্বাস্থ্যসেবার মান আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে।

 

 


জনপ্রিয়


সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন

পূর্বধলায় হামলা ও মামলার প্রতিবাদে জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন

নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলায় দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং পরবর্তীতে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে প্রাণ গেল বড় ভাইয়ের

ময়মনসিংহ সদরে পৈতৃক জমির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে বড় ভাই নিহত হয়েছেন। সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

ভিজিএফের চালের টাকা চাওয়ার অভিযোগে বিএনপি নেতা বহিষ্কার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর বিশেষ ভিজিএফের চাল বিক্রির অর্থ বিকাশের মাধ্যমে চাওয়ার অভিযোগে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার রতনদী-তালতলী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হায়দার আলী শরীফকে দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

নরসিংদীতে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র নতুন পর্ব, দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়

দেশের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র নতুন পর্ব এবার ধারণ করা হয়েছে নরসিংদীতে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জনপদের বৈচিত্র্যময় গল্প তুলে ধরার ধারাবাহিকতায় এবারের আয়োজনের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে জেলার রায়পুরা উপজেলার রামনগরকে।