জাতীয়


৮ লাখ ভবন ধসেপড়ার শঙ্কা, করণীয় কী?


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার

৮ লাখ ভবন ধসেপড়ার শঙ্কা, করণীয় কী?

রাজধানী ঢাকায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলীরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ফল্ট লাইনগুলোতে জমে থাকা শক্তি বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সংস্কার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি এখন সময়ের দাবি।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ মূলত ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা—এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। রাজধানীর কাছেই রয়েছে মধুপুর ফল্ট, আর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেটের কাছে রয়েছে ডাউকি ফল্ট সিস্টেম। দীর্ঘদিন ধরে এসব ফল্টে বড় ধরনের শক্তি নির্গত না হওয়ায় ভূগর্ভে চাপ জমে আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। এতে বেশ কিছু ভবন হেলে পড়ে এবং সারা দেশে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন শত শত মানুষ। এরপরও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ছোট মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট ভূমিকম্পকে বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না। কিন্তু এগুলো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ঝুঁকি ও প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সতর্ক করে। কারণ, ভূমিকম্প কখন আঘাত হানবে—তা নির্দিষ্ট করে আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।

 

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের রাজউক এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে দুর্বল কাঠামোর প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্পে ধসে পড়তে পারে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ভবন।

 

ঢাকার চারতলার বেশি ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার টিনশেড ও কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়লেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে।

 

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে। বালু ও নরম পলিমাটি দিয়ে ভরাট করা এসব এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে মাটি তার শক্তি হারিয়ে তরল পদার্থের মতো আচরণ করতে পারে। এ ঘটনাকে বলা হয় ‘লিকুইফ্যাকশন’। এর ফলে বহুতল ভবন মাটিতে দেবে যেতে বা হেলে পড়তে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো দুর্বল মাটি, জলাশয় ভরাট, বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরান ঢাকাসহ অনেক এলাকার সরু গলি। কোথাও কোথাও রাস্তার প্রস্থ মাত্র ৩ থেকে ৫ ফুট হওয়ায় বড় দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

এ ছাড়া ভবনগুলোর নিয়মিত ফিটনেস যাচাই না করা, চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার বা অপসারণে ধীরগতি, অপরিকল্পিত গ্যাসলাইন এবং দুর্বল পানি ও স্যুয়ারেজ অবকাঠামোও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ভবন ধসের পর ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও উদ্ধার সক্ষমতার ঘাটতিও রয়েছে।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব না হলেও ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। জাপান ও চিলির মতো দেশগুলো দেখিয়েছে, কঠোর নির্মাণনীতি, প্রকৌশলগত সতর্কতা এবং নিয়মিত প্রস্তুতির মাধ্যমে বড় ভূমিকম্পেও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 

ঢাকার ঝুঁকি কমাতে প্রথমেই নতুন ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসির কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ভবন নির্মাণের আগে মাটির লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করা জরুরি।

 

একই সঙ্গে উন্মুক্ত স্থান ও জলাধার রক্ষা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি, পুরান ঢাকার সরু সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই সময়ে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন।

 

এ ছাড়া ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভূমিকম্প ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

 

কারণ ভূমিকম্প কখন হবে, তা হয়তো আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু ভূমিকম্পের পর ঢাকা কতটা প্রস্তুত থাকবে—সেটি এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব।


জনপ্রিয়


জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

এসএসসির ফলাফলে মাইলস্টোন কলেজের প্রশংসনীয় সাফল্য

প্রতি বছরের মতো ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলেও প্রশংসনীয় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাইলস্টোন কলেজ। চলতি বছর মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনে মোট ১৪৯৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং পাস করে ১৪৮৮ জন। এ বছর সারাদেশে পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ এবং ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১.৬৩ শতাংশ হলেও মাইলস্টোন কলেজে পাসের হার ৯৯.৬৭ শতাংশ। পাসকৃতদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৩ জন শিক্ষার্থী।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই যোদ্ধাকে সিএনজি ও রিকশা উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া দুই যোদ্ধার কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও দুটি প্যাডেলচালিত রিকশা উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বগুড়ার ৬৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দাকে দেওয়া হয়েছে দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

হামে আরও ৬ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৮১৮

দেশে হামের সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৮১৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

ড. ইউনূসকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে তিনি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।