অপরাধ


ইয়াবা ব্যবসায়ী বাহারের সুদের জালে নিঃস্ব বহু পরিবার, মিথ্যা মামলা-হুমকির অভিযোগ


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার

ইয়াবা ব্যবসায়ী বাহারের সুদের জালে নিঃস্ব বহু পরিবার, মিথ্যা মামলা-হুমকির অভিযোগ

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর পাগলা এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা, উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেন, ঋণগ্রহীতাদের হয়রানি এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একাধিক বাসিন্দার দাবি, আর্থিক সংকটে পড়া মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে ঋণ নিতে গিয়ে নানা ধরনের শর্তের মুখোমুখি হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের বিপরীতে ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং পরে তা ব্যবহার করে মামলা করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা।

 

গত কয়েক সপ্তাহে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে এবং সংশ্লিষ্ট কিছু মামলার নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

 

সরেজমিনে চর পাগলা এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় সুদের কারবার ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, উচ্চ সুদের ঋণের চাপে অনেক পরিবার ভিটেমাটি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাহার ও বাবলু নামের দুই ভাই, তাদের চাচা আলমগীর এবং বাহারের মা পারভীন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, জরুরি প্রয়োজনে অনেক মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নেওয়ার সময় সাদা স্ট্যাম্প ও ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হন। পরে নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি কিংবা মামলা করার ঘটনা ঘটে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, পারিবারিক প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার পর সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় তিনি নানা চাপের মুখে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

 

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, বাহার সরাসরি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং তার পরিবার উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেন করে। তিনি দাবি করেন, গরিব ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে পরে তা ব্যবহার করে মামলা করা হয় এবং অর্থ আদায় করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

 

স্থানীয় সূত্রের দাবি, সম্প্রতি ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজেদের আহত করে কিংবা গবাদিপশুকে আঘাত করার ঘটনাও ঘটেছে।

 

এ ঘটনায় হোসেনে আরা বাদী হয়ে জিআর মামলা নং-১৩৩ দায়ের করেন। মামলায় হেদায়েত হোসেন দুলাল, সুমন, এমরান হোসেন, নুর ইসলাম, লিটন ও চৌধুরী মিয়াকে আসামি করা হয় এবং বাহারসহ কয়েকজনকে সাক্ষী রাখা হয়। এছাড়া পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে আরও একটি মামলার কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন।

 

চর পাগলা গ্রামের এক বাসিন্দা, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, "বাহার ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের বিরুদ্ধে মাদক, জুয়া, সুদের কারবার এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। আমরা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা চাই।"

 

তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা বলেন, "এলাকায় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মামলা বাণিজ্য করছেন বলে মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে। অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে চান না।"

 

আরেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বাহার বিদেশ থেকে ফিরে গরুর খামার গড়ে তুললেও ওই খামারকে কেন্দ্র করে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে মানুষকে জিম্মি করা হয় এবং প্রতিবাদ করলেই মামলার ভয় দেখানো হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

 

স্থানীয় সূত্রে পাওয়া কয়েকটি মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কিছু মামলায় তদন্তকারী সংস্থা অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত মামলাগুলো খারিজ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আরও কয়েকটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

 

আইনজীবীদের মতে, বিচারাধীন বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। একইভাবে কোনো অভিযোগ দায়ের হলেই তা সত্য প্রমাণিত হয় না, আবার তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া মানেই সব অভিযোগ মিথ্যা—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপরই নির্ভরশীল।

 

এলাকার বাসিন্দাদের মতে, ঋণ, জমি ও মামলা সংক্রান্ত বিরোধের কারণে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

 

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে খামার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বাহার সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, "আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি কোনো মাদক ব্যবসা বা অবৈধ সুদের কারবারের সঙ্গে জড়িত নই।"

 

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ জানায়, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের ভাষ্য, "কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"


জনপ্রিয়


অপরাধ থেকে আরও পড়ুন

লক্ষ্মীপুরে ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার

লক্ষ্মীপুরে এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রবিবার (১৯ জুলাই) রাতে চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশ ওই মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

১৫ বছর পর ধর্ষণ মামলার রায়: ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন তিনজনের

ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রায় ১৫ বছর পর মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কমিশন ছাড়া নড়ত না ফাইল, সওজ প্রকৌশলীর সিন্ডিকেটে জিম্মি পুরো ঠিকাদার মহল

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুদকের অনুসন্ধান চললেও এখনো তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আমিরাতপ্রবাসীদের ঠকিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ চক্র সক্রিয়

সংযুক্ত আরব আমিরাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ভুয়া শিক্ষাগত সনদ তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, প্রকৃত শিক্ষার্থীদের রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে জাল সনদ তৈরি করা হতো।