ফিচার


ক্লাসরুমের বাইরে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখেন


ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

প্রকাশিত:০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার

ক্লাসরুমের বাইরে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখেন

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সকাল মানেই শুধু ক্লাসে ছুটে চলা শিক্ষার্থী বা করিডোরে শিক্ষকদের ব্যস্ত পায়ে হাঁটা নয়। সাতারকুল–বাড্ডা এলাকায় অবস্থিত এই ক্যাম্পাসে প্রতিটি সকাল শুরু হয় আরও আগে শহরের কোলাহল জেগে ওঠার আগেই। ক্লাসরুমে লেকচার শুরুর বহু আগে যাদের হাতে ক্যাম্পাস জেগে ওঠে, তারা কেউ সিলেবাসে নেই, নেই কোনো পোস্টার বা বিজ্ঞাপনে। অথচ তাদের হাত ধরেই শুরু হয় প্রতিটি শিক্ষাদিন।

 

১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আজ প্রায় ৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা। এখানে প্রতিদিন তৈরি হয় ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের নেপথ্যে থাকা নীরব মানুষগুলোর গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে।

 

ভোরের আলো ফোটার আগেই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন নিরাপত্তাকর্মীরা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একই দায়িত্ব। একজন নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকাল থেকে রাত এই জায়গাটাই এখন আমার ঘর। শিক্ষার্থীরা নিরাপদে থাকলেই আমার কাজ সার্থক। চোখে ক্লান্তি থাকলেও কণ্ঠে নেই বিরক্তি। দায়িত্বটাই যেন তার পরিচয়।

 

ক্যাম্পাসের পথঘাট পরিষ্কার রাখতে প্রতিদিন ভোরে ঝাঁটা হাতে নেমে পড়েন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ঝাঁটার শব্দেই শুরু হয় দিনের প্রথম নীরব সুর। একজন কর্মচারী বলেন,
“আমরা না থাকলে জায়গাটা সুন্দর থাকবে না। কিন্তু সেটা কেউ খেয়ালও করে না।” এই কথায় অভিযোগ নেই, আছে দায়িত্ববোধ আর ক্যাম্পাসের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ও নতুন ক্যাম্পাসে থাকা দুটি ক্যান্টিন কেবল খাবারের জায়গা নয়। পুরোনো ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনটি গাছের ছায়ায় ঘেরা এক টুকরো শান্তি। এখানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নন-টিচিং স্টাফরাও কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নেন। ব্যস্ত কর্মদিবসে এই জায়গাটুকুই যেন তাদের নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ।

 

শিক্ষার্থীদের চোখে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আবেগের জায়গা।


ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা আফরিন নিহা বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। এখানকার পড়াশোনার পরিবেশ আর শিক্ষকদের আন্তরিকতা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে।


নন-টিচিং স্টাফদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা খুবই সহযোগিতাপূর্ণ। সবসময় পাশে পাই।

 

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা হামিদ বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে খুব আবেগের জায়গা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এখান থেকেই শুরু হয়েছে।


তার মতে, নন-টিচিং স্টাফদের আন্তরিকতা ক্যাম্পাসের পরিবেশকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তোলে।

 

সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে নামে ভিন্ন এক নীরবতা। দিনের কোলাহল থেমে গেলে মাঠ আর লেকপাড়ের আলো-ছায়া যেন অন্য ভাষায় কথা বলে। কেউ বেঞ্চে বসে থাকে, কেউ ধীরে হেঁটে যায়। তখন বোঝা যায় বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস আর পরীক্ষার জায়গা নয়, এটি অনুভূতিরও আশ্রয়।

 

একদিন মাঠের পাশে দেখা গেল, দিনের কাজ শেষ করে একজন কর্মচারী চুপচাপ বসে আছেন। চারপাশে শিক্ষার্থীদের হাসি আর গল্প, আর তার মুখে এক ধরনের নীরব প্রশান্তি। তখনই প্রশ্ন জাগে এই ক্যাম্পাসকে আমাদের জন্য যে এত সহজ ও সুন্দর করে রাখা হয়, তাদের কথা আমরা কতটা ভাবি?

 

এই প্রশ্ন থেকেই এই গল্পের জন্ম। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল শক্তি শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ নয়। সেই শক্তি আছে নীরব মানুষগুলোর হাতে যারা প্রতিদিন আড়ালে থেকে দৃশ্যমান ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।

 

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তাই কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি নীরব জীবনের এক সমষ্টি। প্রশ্ন রয়ে যায় আমরা কি কখনো তাদের দিকে ফিরে তাকাবো, নাকি তারা চিরকাল সিলেবাসের বাইরেই থেকে যাবে?

 
 

সম্পর্কিত

ফিচারবিশ্ববিদ্যালয়ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

জনপ্রিয়


ফিচার থেকে আরও পড়ুন

আমার ভোট, আমার ভবিষ্যৎ : ৪ শিক্ষার্থীর ৪ দৃষ্টিভঙ্গি

আর মাত্র একদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন মানেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ঠিক করার মুহূর্ত। আর সেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো অংশীদার তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

শৈশবের রচনার স্বপ্ন থেকে রাজনীতির বাস্তব ময়দান

মানুষের সেবায় রাজনীতিতে তিন চিকিৎসক ছোটবেলায় আমরা যখন ‘Aim in Life’ রচনা লিখতাম, প্রায় সবাই একই কথা লিখতাম,বড় হয়ে ডাক্তার হব, গ্রামে ফিরে গিয়ে মানুষের সেবা করব। তখন সেটা ছিল কাগজে-কলমের স্বপ্ন।

মুক্তিযুদ্ধের অদম্য চেতনার প্রতীক: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও অদম্য সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। ২৩ ফুট উঁচু বেদির ওপর অস্ত্র হাতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন সংগ্রাম