ফিচার


শৈশবের রচনার স্বপ্ন থেকে রাজনীতির বাস্তব ময়দান


মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

মো.জিসান রহমান

প্রকাশিত:১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার

শৈশবের রচনার স্বপ্ন থেকে রাজনীতির বাস্তব ময়দান

ছবি: দূরবিন নিউজ


মানুষের সেবায় রাজনীতিতে তিন চিকিৎসক ছোটবেলায় আমরা যখন ‘Aim in Life’ রচনা লিখতাম, প্রায় সবাই একই কথা লিখতাম,বড় হয়ে ডাক্তার হব, গ্রামে ফিরে গিয়ে মানুষের সেবা করব। তখন সেটা ছিল কাগজে-কলমের স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের তিনজন চিকিৎসক সেই শৈশবের স্বপ্নকে রাজনীতির মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছেন। তাঁরা হলেন ডা. তাসনীম জারা, ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন এবং ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী।চিকিৎসা পেশায় থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো,এই তিনজন তার প্রমাণ। এবার তাঁরা আইন প্রণয়নের জায়গা থেকে মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন।

 

ডা. তাসনীম জারা: ডিজিটাল যুগের চিকিৎসক থেকে সংসদ প্রার্থী বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম নিঃসন্দেহে ডা. তাসনীম জারা। তিনি একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত।


ডা. তাসনীম জারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।


করোনাকাল থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুল ধারণা ভাঙা, সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় স্বাস্থ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।


রাজনীতিতে আসার আগে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির (NCP) সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে বর্তমানে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী নন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৯ (খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক ফুটবল।
ডা. তাসনীম জারার নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দর্শন“সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে।”


ইশতেহারে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন:


আধুনিক ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা


মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া


তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি


নাগরিক সেবাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা


জলাবদ্ধতা নিরসন ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা


তাঁর প্রচারণার অন্যতম ব্যতিক্রমী দিক হলো পোস্টারবিহীন নির্বাচন। পরিবেশ রক্ষা ও নগরী অপরিচ্ছন্ন না করার যুক্তিতে তিনি কোনো কাগজের পোস্টার ব্যবহার করছেন না। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ৫ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর মাত্র ৩০ ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।


ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন: হাওরের মানুষের চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনের রাজনীতিতে ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন একটি সুপরিচিত নাম। তিনি একজন চিকিৎসক হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।


তিনি এমবিবিএস ডিগ্রিধারী একজন চিকিৎসক। তাঁর পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায়। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন।


ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সিলেট বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে তিনি হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর আগেও তিনি এই আসন থেকে নির্বাচন করেছেন।
স্থানীয়ভাবে তাঁর জনপ্রিয়তার বড় কারণ হলো চিকিৎসক হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য তিনি বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা ও হামলার মুখেও তিনি মাঠের রাজনীতি থেকে সরে যাননি।


নির্বাচনী অঙ্গীকারে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন:


হাওর এলাকার কৃষকদের সুরক্ষা


বন্যা ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান


গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন


রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিহিংসা কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা


ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী: প্রতিবাদী রাজনীতি ও গরিবের ডাক্তার


ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী নাম। তিনি চিকিৎসক হলেও মূলধারার ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে থেকে সংগ্রামী রাজনীতি করে আসছেন।
তিনি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।


তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর বরিশাল জেলা শাখার সদস্য সচিব এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আসন্ন নির্বাচনে তিনি বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে বাসদের মনোনীত প্রার্থী। তাঁর প্রতীক মই।


ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো  ৩৪তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও সরকারি চাকরিতে যোগদান না করা। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


তিনি বরিশালে নিয়মিত বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। এ কারণে তিনি স্থানীয়ভাবে ‘গরিবের ডাক্তার’ নামে পরিচিত।


২০১৮ সালের বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি প্রথম নারী মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসেন। নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়ে।


তাঁর নির্বাচনী তহবিল গঠিত হয় সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অনুদানে, যা তিনি ‘মাটির ব্যাংক’ নামে পরিচিত করেছেন।


ইশতেহারে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন:


স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় নেওয়া


নারীবান্ধব কর্মসংস্থান


কীর্তনখোলা নদী দখলমুক্ত করা


বরিশাল শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন।

ডা. তাসনীম জারা, ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন এবং ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী তিনজনই ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার হলেও একটি জায়গায় এক। তাঁরা সবাই চিকিৎসা পেশা থেকে মানুষের কষ্ট দেখেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে রাজনীতির মাধ্যমে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগাতে চান।


শৈশবের রচনার সেই স্বপ্ন“ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা”এই তিনজন তা শুধু কথায় নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।

 

  • লেখক:মো:জিসান রহমান, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী

সম্পর্কিত

রাজনীতিফিচার

জনপ্রিয়


ফিচার থেকে আরও পড়ুন

আমার ভোট, আমার ভবিষ্যৎ : ৪ শিক্ষার্থীর ৪ দৃষ্টিভঙ্গি

আর মাত্র একদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন মানেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ঠিক করার মুহূর্ত। আর সেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো অংশীদার তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

ক্লাসরুমের বাইরে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখেন

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সকাল মানেই শুধু ক্লাসে ছুটে চলা শিক্ষার্থী বা করিডোরে শিক্ষকদের ব্যস্ত পায়ে হাঁটা নয়। সাতারকুল–বাড্ডা এলাকায় অবস্থিত এই ক্যাম্পাসে প্রতিটি সকাল শুরু হয় আরও আগে শহরের কোলাহল জেগে ওঠার আগেই। ক্লাসরুমে লেকচার শুরুর বহু আগে য

মুক্তিযুদ্ধের অদম্য চেতনার প্রতীক: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও অদম্য সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। ২৩ ফুট উঁচু বেদির ওপর অস্ত্র হাতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন সংগ্রাম