বিশ্বের সবচেয়ে ছোট সেনাবাহিনী 'সুইস গার্ড'। যারা বর্তমান সময়ে নিয়োজিত বিশ্বের সবচাইতে পুরোনো সেনাবাহিনী গুলোর একটি।
Fearless warrior হিসেবে পরিচিত এই বাহিনী- বিশ্বের অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর চাইতে অনেকাংশেই আলাদা।
কারন, অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর মত, দেশের সর্বভোমত্ব রক্ষা করা এদের প্রধান কাজ নয়। এই বাহিনীর সদস্যরা মূলত, খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপের ব্যাক্তিগত বডিগার্ড হিসেবে কাজ করেন।
পোপের বাসস্থান এবং রোমান ক্যাথলিকদের সদর দপ্তর ভ্যাটিকান সিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই বাহিনীর সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব।
পোপের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর থাকে একেকজন সুইস গার্ড। এমনকি, পোপের জীবন রক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার নজিরও রয়েছে তাদের।
সর্বসাকুল্যে মাত্র ১১০ জনের ক্ষুদ্র বাহিনী হলেও,
সংখ্যায় এরা ভ্যাটিকান সিটির মোট জনসংখ্যার ষোলো শতাংশেরও বেশি। যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম highly militarised কান্ট্রিতে পরিনত করেছে।
সর্বপ্রথম, ১৫০৬ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে এই বাহিনী। মর্যাদাপূর্ণ ভাবেই, গত ৫০০ বছর ধরে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে আসছে তারা।
সাধারণত, পোপের বাসস্থান এবং ভ্যাটিকান সিটির বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাদের।
ডিউটি চলাকালে সুইস গার্ডের সদস্যদের গায়ে থাকে নীল রংয়ের পোশাক, পায়ে বুট আর মাথায় থাকে পালকযুক্ত বিশেষ ধরনের হেলমেট।
হাতে থাকে পনেরো শতকের তৈরি বিশেষ ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। তবে প্রয়োজন পড়লে আধুনিক অস্ত্র চালনাতেও মুন্সিয়ানা দেখাতে পারে তারা।
বিশেষ বিশেষ দিন গুলোতে লাল, হলুদ আর নীল রংয়ের ডোরাকাটা বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করেন সুইস গার্ডের সদস্যরা।
১৫৪ টি আলাদা আলাদা অংশ জোড়া দিয়ে একেকটি পোষাক তৈরি করা হয়। ওজনের দিক থেকে যেগুলো বিশ্বের সবচাইতে ভারী মিলিটারি পোষাক।
ডিউটিরত অবস্থায় পোপের নিরাপত্তার পাশাপাশি ভ্যাটিকান সিটিতে আগত পর্যটকদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন তারা।
তবে, যখন কোনো সুইস গার্ড পোপের প্রসাদের বাইরে হালবার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তিনি Honor duty তে থাকেন। অর্থাৎ তাকে কোনো ভাবেই তখন বিরক্ত করা বা কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।
আবার, কাউকে যদি সামনে বা পিছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তবে বিনা বাঁধায় যেকোনো প্রশ্ন বা সাহায্য চাইতে পারবেন পর্যটকরা।
মর্যাদাপূর্ণ এই বাহিনীতে যোগ দেয়া যেকারো পক্ষে খুবই কঠিন। কারন কেউ চাইলে সুইস গার্ড হতে পারবে না। এর জন্য নিদিষ্ট কিছু যোগ্যতা থাকতে হবে।
যার প্রথমটিই হচ্ছে, আবেদনকারীকে অবশ্যই সুইজারল্যান্ডের নাগরিক হতে হবে। কারন, শুধুমাত্র সুইস নাগরিকরাই যোগ দিতে পারেন এই বাহিনীতে।
আবেদনকারীদের বয়স ১৯ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে থাকতে হবে এবং উচ্চতায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি হতে হবে।
সেই সাথে তাকে অবশ্যই পোপের অনুসারী হতে হবে। তবেই আবেদন করা যাবে সুইসগার্ডের সদস্য হওয়ার জন্য।
পোপের ব্যাক্তিগত বডিগার্ড হিসেবে কাজ করা ব্যাক্তিদের সবাইকে অবশ্যই অবিবাহিত হতে হয়।
এমনকি, দায়িত্ব পালন কালেও তাদের দীর্ঘদিন যাবত অবিবাহিত থাকতে হতো।
কারন, কর্ণেল র্যাংকে পদোন্নতি লাভ করলে তবেই বিয়ে করতে পারতেন তারা। যদিও বর্তমানে এই নিয়মের পরিবর্তন এসেছে।
সুইস গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই বর্তমানে তাদের বিয়ে করার সুযোগ রয়েছে।
সুইস গার্ডে যোগদানের আবেদন করার ক্ষেত্রে, প্রতিটি রিক্রুইটের অবশ্যই সুইস মিলিটারির বেসিক ট্রেনিং থাকতে হবে।
নির্বাচিতদেন পরবর্তীতে ইতালির রোমে ৫ সপ্তাহব্যাপী দিকনির্দেশনা মূলক ট্রেইনিং দেয়া হয়।
ট্রেইনিং সম্পূর্ণ হলে, প্রতিটি সদস্যের পরিবারের সবাইকে নিয়ে পোপের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
এরপরই তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়। প্রাথমিক ভাবে একজন সদস্যকে ২৫ মাসের জন্য সুইস গার্ড হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। যা পরবর্তীতে তাদের সার্ভিস অনুযায়ী আরো বাড়ানো হয়।
এই বাহিনীতে কাজ করা সদস্যদের বেতন মাসিক ১৫০০ ইউরো। যদিও তাও ইতালির গড় বেতনের চাইতেও কম, তবুও তা নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
বেতনের পাশাপাশি বিনামূল্যে বাসস্থান সুবিধা, ছেলে মেয়েদের দেখাশোনার জন্য আলাদা ভাতা পেয়ে থাকেন তারা।
তবে সুযোগ সু্বিধার চাইতেও খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরুর ব্যক্তিগত বাহিনী কাজ করা তাদের কাজে বেশি মর্যাদাপূর্ণ।