শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তুপে পরিণত তুরষ্ক! এমনই পরিস্থিতি হতে পারে বাংলাদেশেরও!
তুরষ্ক তো উতরে উঠবে, এরকম বড়সড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশ কী পারবে সেটা কাটিয়ে উঠতে?
হাজার হাজার ভবন ধ্বসে তুরষ্ক এখন এক মৃত্যুপুরী। ধ্বংসস্তুপের নিচে এখনো চাপা পড়ে আছে অসংখ্যা মানুষ।
একদিকে চাপা পড়া মানুষের বাঁচার আকুতি অন্যদিকে মৃত্যুর মিছিল।
এমন বিপর্যয়ের কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভেঙ্গে পড়া ভবন গুলোর মান!
বিশেষজ্ঞদের মতে, মডার্ন কনস্ট্রাকশন স্ট্যান্ডার্ড না মেনে নির্মিত এসব ভবন ,পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সহ্য করতে না পেরে তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছে।
এসব ভবনের নিচে চাপা পড়ে এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে- ১৮,৩৪২ জনেরও বেশি মানুষ, যা দেশটিতে ১৯৯৯ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পে, নিহত হওয়ার মানুষের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রদেশে ভূমিকম্পের কারনে ধ্বসে পড়া ভবনের সংখ্যা প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার।
এই ভবনগুলো নির্মাণের সময় যথাযথভাবে আইন মানা হয়নি। অধিকাংশ ভবনই জরিমানা দিয়ে বৈধ করা হয়েছিলো। যেগুলোর অধিকাংশই ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়েছে।
এমনকি, নতুন নির্মিত অনেক ভবনও ভেঙ্গে পড়েছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ডেভিড আলেকজান্ডারের মতে- "ভূমিকম্পের তীব্রতা ব্যাপক হলেও এতো বেশি ছিলো না যে শক্তপোক্ত ভবন গুলো ধ্বসে পড়বে।
ভূমিকম্পের দিন অধিকাংশ এলাকায় কম্পন সর্বোচ্চ মাত্রার চেয়ে কম ছিলো।
এরপরও হাজার হাজার ভবন ধ্বসের কারন একটি ,আর তা হলো এসব স্থাপনা ভূমিকম্প সংক্রান্ত নির্মাণ বিধি মেনে তৈরি করা হয়নি।"
উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির দেশ হওয়ায় ,তুরুস্কে ২০১৮ সালেই কঠোর ইমারত বিধি প্রণয়ন করা হয়েছিলো। বিধিতে স্পষ্ট বলা হয়েছিলো যে, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভবন নির্মানে উন্নতমানের কংক্রিট ও ইস্পাতের কাঠামো ব্যবহার করতে হবে।
সেই সাথে ভবনের কলাম ও বিমগুলো, ভূমিকম্প সহনীয় নকশা অনুয়ায়ী স্থাপন করার নির্দেশও দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু অনেক ভবনেই এসবের প্রয়োগ একদমই হয়নি।
২০১৮ সালে তুরুস্কের পরিবেশ ও নগরায়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুয়ায়ী, দেশটির প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ভবন নির্মাণে আইন মানা হয়নি, যা দেশটির মোট ভবনের ৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে বিধি না মেনে জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে, সহজেই ক্ষমা পাওয়া যায় দেশটিতে। ষাটের দশক থেকেই চলে আসছে এই নিয়ম।
অথচ ভূভাগে দুটি ফল্ট লাইন থাকার দরুন, বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা তুরুস্ক। সেখানে এমন নিয়ম অনেকটা জেনেশুনে বিষপান করার মত ব্যাপার।
হয়েছেও তাই, সোমবারের ভূমিকম্পে তুরুস্কের দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ভবন গুলোর মধ্যে ৭৫,০০০ ভবনই এই ক্ষমার আওতায় ছিলো।
যেগুলো নিয়ম মেনে তৈরি হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আরো কম হতে পারতো।
তুরস্কের ভূমিকম্প রেট্রোফিট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিনান তুর্কানের মতে-
‘ধ্বসে পড়া ভবন গুলো সঠিক নিয়ম মেনে তৈরি করা হলে সর্বনিম্ন ৫ হাজার বিল্ডিং পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেতো। প্রাণে বাঁচানো যেতো এসব ভবনের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করা অসংখ্যা মানুষকে।’
তুরস্কের মতই আরেক ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপান। অথচ শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও দেশটিতে হতাহতের পরিমান খুবই কম থাকে। কারন তাদের ভবন গুলো ভূমিকম্প সহনীয় করেই নির্মাণ করা হয়।
মানহীন ভবন নির্মাণের কারনে ,ভবিষ্যতে আরো বড় বিপর্যয়ের মূখোমূখি হতে পারে তুরস্ক।
ভূমিকম্প বিশ্লেষকদের মতে ,আগামী ৭০ বছরের মধ্যে তুরুস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানবে যা ১ লাখ ৯৪ হাজার ভবন ধ্বসের কারন হতে পারে।
আশংকাজনক বিষয় হলো তুরুস্কের মত বাংলাদেশেরও, একই পরিণতি বরণ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনেকদিন ধরেই বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির কথা বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।
৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পই, ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে দিতে পারে রাজধানী ঢাকাকে।
বিশ্লেষকদের মতে এর ফলে, ঢাকায় কয়েক হাজার ভবন ধ্বসে পড়বে। মৃত্যুবরণ করতে পারে ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ।
সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধ্বসে পড়তে পারে।
তার উপর শুধু ভবন ধ্বসেই থেমে থাকবে না, সেই সাথে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। যদি এমনটা হয় তাহলে ঢাকা একটি নরকে পরিণত হবে।
এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ঢাকার অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন লাইন!
বুয়েটের জরিপ অনুযায়ী- ঢাকায় বহুতল ভবনের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ, চট্টগ্রামে ৩ লাখ এবং সিলেটে ১ লাখের মত।
যেগুলোর ৭৫ ভাগই ছয় তলা বা তারও উচুঁ। দেশে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এসব ভবনের বাসিন্দারাই সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন যা তুরুস্কের চাইতেও ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।
ঝুঁকি মোকাবেলায় ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর মানহীন ভবন চিহৃিত করে এখন থেকেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হলে এর চড়া মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যতে।