
তুরস্কের ভূমিকম্পে দূর্গতদের সেবায় নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকুই উজাড় করে দিয়েছিলো বাংলাদেশের উদ্ধারকারী দল। বিপন্ন তুরস্কের পাশে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাংলার সন্তানরা। ভালোবাসা দিয়ে সেই সাহায্যের প্রতিদানও দিয়েছে তুরস্ক। বন্ধু নয়, বাংলাদেশকে এখন তুরস্ক চেনে ভাই হিসেবে। তুরস্কে ভূমিকম্পের পর দুর্গত মানুষের সেবায় দেশ ছেড়েছিলো ৪৬ সদস্যের বাংলাদেশি উদ্ধারকারী দল। সেই দায়িত্ব পালন শেষ করে সম্পূর্ণ সুস্থভাবে সোমবার দেশে ফিরে এসেছে পুরো দল। দেশে ফিরে উদ্ধারকর্মীরা শোনালেন নিজেদের সফলতা আর তুরস্ক থেকে পাওয়া ভালোবাসার গল্প। ভূমিকম্পের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ গাজিয়ানতেপের আদিয়ামান শহরেই কাজের ভার পড়েছিলো বাংলাদেশের। দুর্গম সেই স্থানে যন্ত্রপাতিসহ প্রায় সময় লম্বা পথ হাঁটতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের। কখনোবা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নামতে হয়েছে চাপা পড়া ভবনের একেবারে ভেতরে। এমন বিপদ আর কষ্টের মাঝেও দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি কেউ। বিশেষ করে প্রচন্ড ঠান্ডায় বারবার বাঁধা আসছিলো উদ্ধারকাজে। কয়েকবার থামাতে হয়েছে উদ্ধার কার্যক্রম। সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ ছিলো একের পর এক আফটার শক। আফটার শকের প্রভাবে নতুন করে ধ্বস দেখা দিলে তা উদ্ধারকর্মীদের জীবনের জন্যই ঝুকিপূর্ণ হতো। কিন্তু এতসব বিপদ তুচ্ছ করেই তুরস্কের জনগণকে সেবা দিয়ে যায় বাংলাদেশ। ফেরার পথে তাই তুরস্কের জনগণ ধন্যবাদ দিয়েছে বাংলাদেশকে। উষ্ণ আলিঙ্গনে বাংলার সন্তানদের বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলো দুর্গত মানুষেরা। বাংলাদেশের কাজে অভিভূত হয়ে তুর্কি জনগণের সহজ স্বীকারোক্তি, তোমরা আমাদের বন্ধু নও, তোমরা আমাদের ভাই। আদিয়ামান শহরে কাজের সময়গুলো এভাবেই বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশের উদ্ধারকারী দলের দলনেতা এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দিনমণি শর্মা। দূর্গত অঞ্চলের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬ তলা ভবন ভেঙে এক তলার সমান হয়ে যায়। বড় বড় ভবন সবই ছিলো বিধ্বস্ত। সেখানে যখন প্রবেশ করি, আমাদের জীবনের ঝুঁকি ছিলো।’ তবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলেও আদিয়ামান শহরটি নির্মাণের দিক থেকে পরিকল্পিত ছিলো বলে জানান তিনি। যার ফলে কাজের দিক থেকে কিছুটা সহজ পরিস্থিতি পেয়েছিলেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন বলেন, তুরস্কের এই ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজ পরিচালনার পর আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশিদ জানান, উদ্ধার অভিযানের সময় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের কর্মীরা। আর তুরস্কের এই অভিজ্ঞতা দেশের যেকোনো বিপর্যয়েও ব্যাপক সহায়তা করবে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে এমন ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজের সক্ষমতা আছে বলেও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে মানবিক বিপর্যয়ে কাজের জন্য ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত আছে বলে নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক। উল্লেখ্য, গত ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের গাজিয়ানতেপে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দূর্গত মানুষের সেবার একটি উদ্ধারকারী দল পাঠায় বাংলাদেশ। সেনাবাহিনীর ২৪ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১২ জন ছাড়াও এই দলে ছিলেন ১০ জন চিকিৎসক। দূর্ঘটনার তিনদিন পর, ৯ ফেব্রুয়ারি বিপুল পরিমাণ সাহায্য নিয়ে তুরস্কে পৌঁছায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী দলটি। উদ্ধারকার্য শেষে গত সোমবার দেশে ফিরে আসে দলটি। মাত্র ১০ দিনের জন্য অবস্থান করলেও পুরো বিশ্বকে নিজেদের কাজে মুগ্ধ করেছে বাংলাদেশ। এই অভিযানে দুই প্রদেশের মোটঁ ১১ টি ভবনে উদ্ধার অভিযান চালায় প্রতিনিধি দলটি। এসময় তারা একজন কিশোরীকে জীবিত এবং ২৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। সফল এই মিশন শেষে তুরস্কের আদানা বিমানবন্দর থেকে বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে চেপে বাংলাদেশ ফিরে আসে উদ্ধারকারী দল।



