নির্মাণে পিছিয়ে থাকলেও ধ্বংসে এগিয়ে তুরষ্ক! কারণ বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চালকবিহীন ড্রোন প্রযুক্তির মালিক তুরস্ক।
কয়েকবছর ধরে একের পর এক ড্রোন বিমানের মডেল তৈরি করে পুরো বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে দেশটি।
কিছুদিন আগেও সবচেয়ে বেশি সময় ধরে আকাশে ওড়ার রেকর্ডটিও তুরষ্কের ড্রোনেরই!
দেশের আবাসন খাত ও মূল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেও অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তিতে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যে অত্যন্ত সফল সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না!
নিজেদের সামরিক খাতে এসব ড্রোনের ব্যবহারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীগুলোর পছন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তুরষ্কের ড্রোন!
অনেক দেশের সাথেই দেদারসে চলছে তুরষ্কের ড্রোন বাণিজ্য! কিন্তু দেশটির এমন সাফল্যের রহস্য কী? মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে কিভাবে ড্রোন বিমান প্রযুক্তিতে সেরা দেশে পরিণত হলো তারা?
তুরস্কের এই সাফল্যের পেছনে আসল ভুমিকা রেখেছে প্রয়োজন। দেশটির অভ্যন্তরে সক্রিয় রয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
দীর্ঘদিন ধরে যাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছিলো তারা। কিন্তু সেসব অভিযানের অধিকাংশই ছিল দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে।
যেখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলো না এরদোয়ানের বাহিনি। তখনই ড্রোনের কথা ভাবতে শুরু করে তুরস্ক। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন বিমানের দুর্দান্ত সাফল্য দেখেছিলো তারা।
আর এজন্যই দেশের অভ্যন্তরে খুঁটি গাড়া বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করার জন্য এরকম ড্রোন বিমানের প্রয়োজন অনুভব করে তুরস্ক। কিন্তু উপযুক্ত ড্রোন ছিল না তাদের।
এক্ষেত্রে প্রত্যাশা ছিলো বন্ধুরাষ্ট্র আমেরিকার সাহায্য পাবে। কিন্তু তুরস্ককে অস্ত্রবাহী ড্রোন দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহই দেখায়নি আমেরিকা।
ফলে অন্যান্য দেশ থেকে ড্রোন পাওয়ার চেষ্টা করে তুরস্ক। কিন্তু সেখানেও তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় তাদের। এরদোয়ান তখন বুঝতে পারেন নিজেদের ড্রোন নিজেদেরই তৈরি করতে হবে ।
এছাড়া সহজ কোন উপায় ও ছিলো না। তুরস্কের এই প্রয়োজনের সময় দৃশ্যপটে হাজির হন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জামাতা সেলজুক বায়রাক্তার, যাকে গন্য করা হয় তুরস্কের ড্রোন শিল্পের দাদা হিসেবে।
বায়রাক্তার পড়াশোনা করেছিলেন বিখ্যাত পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৪ সালে একসাথে একাধিক ড্রোন নিয়ন্ত্রনের উপায় নিয়ে একটি যৌথ গবেষনা করেছিলেন তিনি।
এরপর ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে নিজের দেশ তুরস্কে ফিরে আসেন এরদোয়ানের জামাতা। দেশে ফিরেই তিনি চালু করেন 'বায়কার টেকনোলজিস' নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
যেটি ড্রোন বিমান বানানো শুরু করে তুরস্কের সেনাবাহিনীর জন্য। শুরুতে তার কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়লেও পরবর্তিতে সরকারের সহায়তায় ঘুরে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠানটি।
এরদোয়ানের তখন শক্তিশালী ড্রোন বিমান প্রয়োজন, এই সুযোগ গ্রহণ করে সেলজুকের কোম্পানি। কিছুদিনের মধ্যে টিবি-টু মডেলের ড্রোন তৈরি করে সরবরাহ করে তারা।
১৫০ কিলোমিটার রেঞ্জের সেই ড্রোন ছিলো তুর্কি সেনাবাহিনীর জন্য ভীষণ উপযুক্ত। এটির মাধ্যমে বিদ্রোহীদের উপর হামলা চালিয়ে বেশ সাফল্য পায় তুরস্ক।
এরপর একের পর এক ড্রোন বিমান তৈরি করতে সক্ষম হয় দেশটি। গত কয়েকবছরে স্যাটেলাইটের সাথে লিঙ্ক করা 'আঙ্কা-এস ড্রোন' ছাড়াও বেশ কয়েকটি মডেলের সফল ব্যবহার করেছে তুরস্ক।
তাদের আঙ্কা এস মডেলের ড্রোন আকাশে উড়েছিলো একটানা ৩০ ঘণ্টা ৩০ মিনিট যা ড্রোন বিমানের বিশ্ব রেকর্ড।।
আঙ্কা-এস ইউকেভ মডেলের এই ড্রোন নিউ জেনারেশন প্রযুক্তির। এর আগেও টানা ২৪ ঘন্টা আকাশে ওড়ার রেকর্ড করেছিলো এটি।
এছাড়া আগের মডেলের ড্রোন বহন করতে পারতো ২৫০ কেজি ওজন। এখন নতুন প্রজন্মের আঙ্কা এস ড্রোন প্রায় ৩৫০ কেজি ওজন বহন করতে পারে।
দেশটির এমন অভাবনীয় চালকবিহীন ড্রোনের সাফল্যে রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও।
ইতিমধ্যই তুরষ্কের ড্রোন যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে শুরু করেছে। পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী পরাশক্তি হিসেবে তুরষ্ককেও দিয়েছে পরিচিতি!