চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সাথে দেখা করতে চান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের জন্য বেইজিং এর দেয়া প্রস্তাব নিয়ে, তার সঙ্গে আলোচনা করতে চান। এই সাক্ষাৎ বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য জরুরি বলে মনে করেন জেলেনস্কি।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এক বছরে পূর্ণ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক দেশই যুদ্ধ বন্ধের জন্য মধ্যস্থতা করার উদ্যোগ নিয়েছে। তুরস্ক বেশ কয়েকবার দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেছে। বৈঠকে অনেক আলাপ আলোচনা হলেও, কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায় নি।
এই প্রক্রিয়ায় নতুন করে চীনের নাম যুক্ত হতে চলেছে। দেশটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই শান্তি স্থাপনের আহবান জানিয়ে আসছে। রাশিয়াকে সরাসরি সমর্থন না দিয়ে, ভারসাম্য কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে চীন। সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধের জন্য চীন ১২ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। এটিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।তিনি বলেছেন, “আমি সত্যিই আশা করব চীন রাশিয়াকে কোন অস্ত্র সরবরাহ করবে না,”।
শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে তিনি চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠকের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।এখন চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য সাড়া পেলে, যুদ্ধ বন্ধে নতুন আশা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু চীনের এই প্রস্তাবকে পশ্চিমা দেশগুলো সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখছে। তারা বলছে, এতে মূলত রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। চীন রাশিয়াতে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানোর কথা চিন্তা করছে, এমন কথাও বলছে পশ্চিমা দেশগুলো।
তবে পশ্চিমাদের অভিযোগ চীন প্রত্যাখান করেছে। অন্যদিকে রাশিয়া এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। মস্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণলায়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমরা বেইজিং এর সঙ্গে সহমত পোষণ করি।"সম্প্রতি চীনের শীর্ষ কূটনীতিক রাশিয়া সফর করেছেন। এই সফরের পর পরই, চীন যুদ্ধ বন্ধে ১২ দফার এই প্রস্তাব পেশ করলো।
যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পাশে আছে চীন। দেশটি চলমান যুদ্ধে রাশিয়াকে সরাসরি সমর্থন না দিলেও, নৈতিকভাবে পুতিনের পাশে থেকেছে। জাতিসংঘ সহ বৈশ্বিক সকল ফোরামে রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে চীন। এইসব কারণে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ইউক্রেনে পুতিনের মুখরক্ষা করতেই, চীন শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে।
কারন পশ্চিমাদের অবিরাম সমর্থন, যুদ্ধে ইউক্রেনের শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মিত্রদের পাঠানো আধুনিক ট্যাংকগুলো যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছে। পোল্যান্ড, জার্মানির তৈরি লেপার্ড টু ট্যাংক পাঠিয়েছে এবং আরো পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্য দেশগুলোও বিশাল প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। জার্মানি বলেছে তারা আরও ১৪ টি ট্যাংক পাঠাবে। স্পেন এবং কানাডাও ট্যাংক পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। যুক্তরাষ্ট্র ৩১ টি এম অ্যাব্রামস ট্যাংক, ও ব্রিটেন ১৪ টি চ্যালেঞ্জার ট্যাংক পাঠাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
পশ্চিমাদের এমন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, দীর্ঘ সময় ধরে অবিরাম সমর্থন, পুতিনের জন্য কোনো স্বস্তির খবর বয়ে আনছে না।লম্বা সময়ে যুদ্ধ চলায়, রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বেড়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি। এই অবস্থায় যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে চেষ্টা চালালেও, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পরাশক্তির ভাব রক্ষায় পুতিন এই চেষ্টা নিজে না চালিয়ে, চীনকে দিয়ে করলে উভয়কূল রক্ষা পাবে। আর এতে চীনের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। বৈশ্বিক অংগনে তার ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হবে, যা আগামী দিনে চীনের বিশ্বনেতা হওয়ার পথকে সহজ করবে। আশংকার বিষয় হলো, চীনের এইসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে পশ্চিমা দেশগুলো সহায়তা না করলে, শান্তি স্থাপন অধরাই থেকে যাবে।
ভূরাজনীতির খেলা ইউক্রেন যুদ্ধকে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে, যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ দুই দেশের হলেও, এখানে বিশ্ব মোড়লদের বিশাল সব স্বার্থ জড়িয়ে আছে। সব মোড়লদের স্বার্থ পূরণ করে, যুদ্ধের সমাপ্তি টানা দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে।
এখন দেখার বিষয়, চীন এই জটিল সমস্যায় কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে।