বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বন্ধন এখন আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চলেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, শ্রম ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত প্রথম রাজনৈতিক পরামর্শক সভায় উভয় পক্ষ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করে।
সভার যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রতি দুই বছর পরপর এ ধরনের বৈঠক ঢাকা ও কুয়েত সিটিতে পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে। সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশ নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) নজরুল ইসলাম, আর কুয়েতের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির এশীয় বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামিহ ইসা জোহর হায়াত। দুই দেশের প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সামিহ ইসা বৈঠক শেষে বলেন, কুয়েত শ্রম সহযোগিতা ও অন্যান্য খাতে নতুন চুক্তি করতে আগ্রহী। তিনি জানান, শিগগিরই খাদ্যনিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচি, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ইস্যুতে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। বাংলাদেশের সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, “১৯৯০ সালে কুয়েতে দখলদারত্বের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিঃস্বার্থ সহায়তা আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে কুয়েত।” পাঁচ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি সেনা সে সময় মানবিক সহায়তা ও মাইন অপসারণে অংশ নিয়েছিলেন। কুয়েত এখন চায় সেই সহযোগিতার ধারা আধুনিক প্রেক্ষাপটে আরও সম্প্রসারিত হোক।
এছাড়া বিমান চলাচল খাতে ফ্লাইট বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও বৈঠকে গৃহীত হয়। বর্তমানে কুয়েত এয়ারওয়েজ সপ্তাহে ৭টি, আল-জাজিরা এয়ারওয়েজ ১৪টি ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৩টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। উভয় পক্ষ নতুন রুট চালু ও ফ্লাইট সংখ্যা বাড়াতে সম্মত হয়েছে, যা বাণিজ্য ও শ্রম সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে।
বৈঠকে ‘কুয়েত ভিশন ২০৩৫’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনশক্তি সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। জ্বালানি, অবকাঠামো, আইসিটি ও হালাল খাদ্য খাতে যৌথ উদ্যোগ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ-কুয়েত ব্যবসায়ী ফোরাম আয়োজন এবং যৌথ বাণিজ্য কমিটি পুনরায় সক্রিয় করার ব্যাপারেও ঐকমত্য গঠিত হয়।
উভয় দেশ কুয়েত ফান্ডের সহায়তা নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও বিমান যোগাযোগ খাতে নতুন প্রকল্প শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করে। সব মিলিয়ে এই বৈঠক শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ককে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার এক নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।