আন্তর্জাতিক


নকল বাড়িতে মহড়া, ড্রোন ও ব্লোটর্চ ব্যবহার-যেভাবে গোপন অভিযানে মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার

নকল বাড়িতে মহড়া, ড্রোন ও ব্লোটর্চ ব্যবহার-যেভাবে গোপন অভিযানে মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে মাসের পর মাস ধরে নিখুঁত ও গোপন প্রস্তুতি চালায় যুক্তরাষ্ট্র। গোয়েন্দা নজরদারি, নকল বাড়ি নির্মাণ করে মহড়া, আকাশ–স্থল–নৌ—তিন পথের সমন্বিত সামরিক অভিযান মিলিয়ে এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জটিল অপারেশন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মাদুরোর প্রতিদিনের জীবনযাপন কোথায় থাকছেন, কী খাচ্ছেন, কখন ঘুমাচ্ছেন সবকিছুই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। এমনকি তাঁর পোষা প্রাণীর গতিবিধিও নজরদারির বাইরে ছিল না। ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরের একটি সূত্রসহ সীমিত একটি দল এই তথ্য সংগ্রহে যুক্ত ছিল।

 

ডিসেম্বরের শুরুতে অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুমোদন পায়। এর নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে মাদুরোর কারাকাসের সেফ হাউসের আদলে একটি নকল বাড়ি তৈরি করা হয়। সেই কাঠামোয় প্রবেশপথ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সম্ভাব্য প্রতিরোধ কৌশল যাচাই করতে একাধিকবার মহড়া চালান মার্কিন এলিট ফোর্সের সদস্যরা।

 

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের গোপনীয়তা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে কংগ্রেসকেও আগাম কিছু জানানো হয়নি। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় চার দিন আগেও একবার অভিযান স্থগিত করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত নির্দেশে শুক্রবার রাতে অভিযান শুরু হয়।

 

Related posts here

 

শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, বড়দিন ও নতুন বছরের ছুটির সময়েও সেনারা প্রস্তুত ছিলেন। সঠিক সময় ও নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

 

মার্কিন স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল “অত্যন্ত জটিল ও নিখুঁত পরিকল্পনার ফল”। কারাকাসে মধ্যরাতের আগে আকাশপথে প্রথম হামলা শুরু হয়। পরে স্থলপথে ঢুকে পড়ে মার্কিন এলিট ডেল্টা ফোর্স।

 

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযানে ১৫০টির বেশি বিমান অংশ নেয়। কারাকাসের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ও বিমান চলাচলের শব্দ শোনা যায়। লা কার্লোটা বিমানঘাঁটি ও লা গুয়াইরা বন্দরে হামলার তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে। অভিযানের আগে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

 

রাত ২টা ১ মিনিটে মার্কিন বাহিনী মাদুরোর বাড়িতে পৌঁছায়। ভারী অস্ত্রের পাশাপাশি ইস্পাতের দরজা ভাঙতে ব্লোটর্চ ব্যবহার করা হয়। গোলাগুলির মধ্যে এক পর্যায়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা নিহত না হলেও কয়েকজন আহত হন বলে জানানো হয়েছে।

 

ভোর ৪টা ২০ মিনিটে মাদুরো দম্পতিকে বহনকারী হেলিকপ্টার ভেনেজুয়েলা ছাড়ে। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববাসীকে বিষয়টি জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে নিয়ে গিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক পাচার, দুর্নীতি ও ‘নারকো-টেররিজম’–সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার বিচার শুরু হবে।

 

এই অভিযানের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে লাতিন আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ব্রাজিলসহ একাধিক দেশ একে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি ছিল আইনগত ও নিরাপত্তাগত প্রয়োজন থেকেই নেওয়া পদক্ষেপ।

 

বিশ্লেষকদের মতে, নকল বাড়িতে মহড়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অভিযানের প্রতিটি ধাপ দেখিয়ে দেয় মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা দীর্ঘ সময় ধরে, কতটা সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় এই অভিযান পরিচালনা করেছে।


সম্পর্কিত

নিকোলাস মাদুরোভেনেজুয়েলাযুক্তরাষ্ট্র

জনপ্রিয়


আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন

৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ- কোন দেশে কত নিহত, বাংলাদেশির সংখ্যা কত?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। শুধু ইসরায়েল নয়, ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক বিজয় হয়েছে: ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান-এর সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক বিজয়’ অর্জন করেছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ‘ইরানের বিজয়’

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উত্থাপিত ১০ দফা দাবি মেনে নিয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে নিজেদের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্র ‘রেড লাইন’ পার হলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে: ইরান

যুক্তরাষ্ট্র যদি তেহরানের নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে, তাহলে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে- এমন কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।