আইন আদালত
আফগান ফেরত যোদ্ধা থেকে হুজির আমির
মাসুদ সুমন ও সুব্রত চন্দ:
নববর্ষের দিনে রমনার বটমূলে বোমা হামলার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুফতি শফিকুর ইসলামকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র্যাব)।
এলিট এই ফোর্স জানিয়েছে, মুফতি শফিকুর ইসলাম আফগান ফেরত তালেবান যোদ্ধা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তারা কয়েকজন মিলে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) গঠন করেন। পরবর্তীতে তিনিও এ সংগঠনের আমির হন। ৯৮ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সুরা সদস্য ছিলেন।
শুক্রবার র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন তাদের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
কে এই ভয়ঙ্কর জঙ্গি শফিকুর:
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে একটি জনসভা চলাকালে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা হয়। এ ঘটনায় ২৪ জন নিহত হন এবং প্রায় তিন শতাধিক গুরুতর আহত হন। ঢাকার মতিঝিল থানায় একটি হত্যা ও হত্যা চেষ্টার সহযোগিতাসহ ২টি পৃথক মামলা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গত ১০ অক্টোবর ২০১৮ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যাল ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মুফতি শফিকুর রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
র্যাব জানায়, গ্রেফতার শফিকুর রহমান এই গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। অপরদিকে একই ঘটনায় ঢাকার মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অপর একটি মামলা হয়। গ্রেফতারকৃত মুফতি শফিকুর রহমান বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলারও পলাতক আসামি। এছাড়াও ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানাধীন বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ ৫ জন নিহত এবং কমপক্ষে শতাধিক লোক আহত হন। এ মামলায় গ্রেফতার শফিকুর রহমান কিবরিয়া হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। এছাড়া গ্রেফতার আসামি মুফতি শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় সর্বমোট ৬টি গ্রেফতারী পরোয়ানা রয়েছে।
শফিকুর নিজ গ্রাম থেকে ৫ম শ্রেণী পাশ করার পর মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করে। ১৯৭৫ সালে চকবাজার, ঢাকায় অবস্থিত একটি মাদ্রাসা হতে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত হেদায়ায় পড়াশোনা করে। হেদায়া পাস করার পর ১৯৮৩ সালে পার্শ্ববর্তী দেশে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) পাস করে বাংলাদেশে ফেরত আসে। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে ইউসুফ বিন নুরী মাদ্রাসায় ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হয়ে ৩ বছরের ইফতা (ফতোয়া) কোর্স সম্পন্ন করে। ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানে অবস্থানকালীন সে আফগানিস্তানে চলে যায় এবং তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। অতঃপর ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আসে। বাংলাদেশে আসার পর সে ঢাকার খিলগাঁও এ একটি মাদ্রাসায় পার্ট টাইম শিক্ষকতা শুরু করে।
১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচীর নিউ টাউন এ পড়াশোনা করার সময় সেই প্রতিষ্ঠানে মুফতি হান্নানও পড়াশোনা করতে গেলে তার সাথে পরিচয় হয়। পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ভ্রমনে গেলে আফগানিস্তানে থাকাকালীন জঙ্গী সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদের’ সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। আফগানিস্তান থেকে দেশে এসে ‘হরকাতুল জিহাদ (বি)’ নামে একটি জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা করে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে দেশে ফেরত এসে সমমনাদের সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ‘হরকাতুল জিহাদ (বি)’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এবং দাওয়াতের কাজ শুরু করে। ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সে ‘হরকাতুল জিহাদ (বি)’ এর প্রচার সম্পাদক ছিল। ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সে হরকাতুল জিহাদ এর আমীর ছিল। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সে হরকাতুল জিহাদ এর সুরা সদস্য ছিল।
চরাঞ্চলে আত্মগোপনে থেকে মসজিদে ইমামতি, দিতেন জঙ্গি ট্রেনিং:
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, দেশের অভ্যন্তরে হরকাতুল জিহাদকে সংগঠিত করতে বিভিন্ন সময় আত্মগোপনে থেকে জঙ্গিদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিতেন মুফতি শফিকুর। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পলাতক থেকে বিভিন্ন বোমা হামলা এবং জঙ্গি হামলার পরিকল্পনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। পলাতক থেকে তিনি সেসময় জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। নিজের পরিচয় লুকাতে তিনি আত্মগোপনে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতির কাজ করেন। বিশেষ করে দেশের চরাঞ্চল এলাকার মসজিদগুলোকে বেছে নিতেন শফিকুল ইসলাম। নাম ঠিকানা এবং ভোটার আইডি কার্ড পরিবর্তন করে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
খন্দকার আল মঈন বলেন, ভুয়া পরিচয়ে পলাতক থাকার কারণেই তাকে শনাক্ত করা যায়নি। নরসিংদির একদম চরাঞ্চলে থাকার কারণে তাকে চেনা যায়নি। এই সময় তিনি আব্দুল করিম নামে নিজেকে পরিচয় দিতেন। পরিবারের সাথে যোগাযোগ না করার কারণে তাকে শনাক্ত সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে শুধুমাত্র কয়েকবার ছেলের সাথে যোগাযোগ করেছেন। কয়েকদিন থেকে তাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়। র্যাব নিরাপত্তা চিন্তা করে তিনি যে মসজিদের ইমাম ছিলেন, সেই এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেনি। সেখানে তার জনপ্রিয়তা থাকার সম্ভাবনা ছিল। এতে জনগণের পক্ষ থেকে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারতো। তাই তাকে সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় নি।
জনপ্রিয়
আইন আদালত থেকে আরও পড়ুন
আমির হামজাকে গ্রেপ্তারে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ
জ্বালানি মন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে দায়ের করা মানহানির মামলায় কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ড. ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ এনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে।

শেরপুরে ধর্ষণ ও মানবপাচার মামলার দুই আসামি গ্রেফতার
শেরপুরে পৃথক দুটি মামলায় ধর্ষণ ও মানবপাচারের অভিযোগে দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১৪। সোমবার (২০ এপ্রিল ২০২৬) চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে পৃথক অভিযানে তাদের আটক করা হয়।

সিআইডি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও পক্ষপাতমূলক তদন্তের অভিযোগ
ঢাকার পল্লবী থানায় দায়েরকৃত একটি সিআর মামলার তদন্তকে ঘিরে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বাংলাদেশ পুলিশ বরাবর একটি বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।

.jpg)







