আইন আদালত
আন্ডারওয়ার্ল্ডে বোতল চৌধুরীর কানেকশন যেভাবে!
বনানীর ক্লাব ট্রামসে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিভিন্ন ইস্যুতে বাক-বিতন্ডা হয়। তাই উচিত শিক্ষা দিতে সোহেলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ডন।
বুধবার দুপুরের রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ তথ্য জানান।
সোহেল হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ২৪ বছর ধরে পলাতক থাকা আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, মূলত সোহেল চৌধুরীকে উচিত শিক্ষা দিতেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। আর এই পরিকল্পনায় তার সাথে ছিলেন আশিষ রায় চৌধুরীও।
সংবাদ সম্মেলনে আশিষ রায় চৌধুরী যেভাবে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সান্নিধ্যে যান এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডে যেভাবে তার যোগাযোগ স্থাপন হয় সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে র্যাব।
যেভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে গড়ে উঠে বোতল চৌধুরীর যোগসূত্র:
র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার হওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আশিষ জানায়, ১৯৯৬ সালে বনানীর আবেদীন টাওয়ারে আশিষ রায় চৌধুরী এবং আসাদুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলামের যৌথ মালিকানায় ট্রাম্পস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকার পুঁজির নিয়ে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে ২৫ লাখ টাকা করে লগ্নি করেন আশিষ ও বান্টি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ক্লাবে বিভিন্ন বয়সের মানুষ সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর রাত পর্যন্ত অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য আসত। পর্যায়ক্রমে এই ক্লাবটি সকল আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন এবং গ্যাং লিডারদের একটি বিশেষ আখড়ায় পরিণত হয় এবং এখানে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত ছিল আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের।
আজিজ মোহাম্মদ ভাই মূলত ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের চক্রগুলোর সাথে বিভিন্ন ধরণের মিটিং বা তাদের পরিচালনা করার জন্য সেই ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত করত এবং সেই ক্লাবকে ব্যবহার করত। সেই সুবাদে ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম এবং আশিষ রায় চৌধুরীর সাথে তার সখ্যতা তৈরি হয়। আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাতিজিকে বান্টি ইসলাম বিয়ে করার সুবাদে তাদের মধ্যে একটি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল।
এদিকে বান্টি এবং আশিষ যুবক বয়স থেকে একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পরবর্তীতে তাদের এই বন্ধুত্ব ব্যবসায়িক অংশিদারিত্বে রূপ নেয় আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বান্টি ইসলাম ও আশিষ রায় চৌধুরী একসাথে ট্রাম্পস ক্লাবে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড ও অপরাধ জগতের ব্যক্তিদের মাধ্যমে নানা অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করত।
ক্লাবের ঠিক পাশেই ছিল ওই সময়কার বনানীর সবচেয়ে বড় মসজিদ বা বনানীর জামে মসজিদ। যেহেতু এই ট্রাম্পস ক্লাবে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে সারারাত বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলতো, চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী বনানী মসজিদ কমিটিকে সঙ্গে নিয়ে বারবার ট্রাম্পস ক্লাবের এ ধরণের অশ্লীলতা বন্ধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তবে তারা প্রতিবাদ জানানোয় বান্টি ইসলাম এবং আশিষ রায় চৌধুরীর ব্যবসায়িক স্বার্থে মারাত্মকভাবে আঘাত লাগে। অপরদিকে আজিজ মোহাম্মদ ভাই যেহেতু আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেক্টিভিটি মেইনটেইন করার জন্য ঢাকায় ট্রাম্পস ক্লাবকে একটা সেইফ হাউজ হিসেবে বেছে নিয়েছিল তার সেই স্বার্থেও আঘাত লাগে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সাথে নায়ক সোহেলের সরাসরি তর্ক এবং এক পর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। আজিজ মোহাম্মদ ভাই এতে সোহেল চৌধুরীর ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বান্টি ইসলাম ও আশিষ রায় চৌধুরীকে নিয়ে তিনি পরিকল্পনা করতে থাকেন।
ট্রাম্পস ক্লাবে তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তখন বান্টি ইসলাম, আশিষ রায় চৌধুরী ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনকে দিয়ে সোহেল চৌধুরীকে হত্যার প্রস্তাব দেয়। তৎকালীন মাফিয়া আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং বান্টি-আশিষের অনুরোধে ইমন তাদের সাথে সম্পর্ক আরো জোরদার করতে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করে ইমন।
সোহেল হত্যা মামলার আসামিদের অবস্থান জানিয়ে র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাই বর্তমানে আমেরিকায় আছেন। আরেক আসামি বান্টি ইসলাম কানাডায় রয়েছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও ফারুক চৌধুরী জেলে রয়েছেন। এ মামলায় আরও দুজন পলাতক আছেন।
২৪ বছর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আশিষ:
এর আগে মঙ্গলবার রাতে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরীক গ্রেফতার করে র্যাব। গুলশান-১ নম্বরের ফিরোজা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ২৩ বোতল বিদেশি ব্র্যান্ডের মদ, বেশ কিছু বিয়ার ও সীসার সরঞ্জামসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, এই ফ্ল্যাটটি বোতল চৌধুরীর না, এটা অন্য আরেক ব্যক্তির নামে নেয়া। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে ওই ফ্ল্যাটে আত্মগোপনে ছিলেন পলাতক এই আসামি। ফ্ল্যাটের মালিক বোতল চৌধুরীর মত অভিজাত অপরাধীদের ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিতেন। সেটি অপরাধীদের আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার হত।
প্রচুর টাকা ভাড়ার বিনিময়ে ফ্ল্যাটের মালিক অপরাধীদের সেখানে আত্মগোপনে থাকার এবং নানা ধরণের অনৈতিক কাজ করার সুযোগ করে দিতেন। ফ্ল্যাটটিতে মদের মিনি বারও গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে নানা ধরনের দেশি-বিদেশি মদের সংগ্রহ করে রাখা হত। ফ্ল্যাটটি যিনি অপরাধীদের কাছে ভাড়া দিতেন, তাকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছেন র্যাবের কর্মকর্তারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি বোতল চৌধুরী দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন প্রকাশ্য। তিনি নিয়মিত রিজেন্ট এয়ারওয়েজের চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে বিমানবন্দরের ভেতরে যাতায়াত করতেন। তার কাছে ছিল বিমানবন্দরের প্রবেশের ডিউটি পাসও, যেটি সংগ্রহ করার বিষয়ে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে তদন্ত করা হয়। তারপরও কীভাবে এই অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন সেটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধুম্রজাল।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রী-এমপি-ভিআইপিদের সান্নিধ্যে থাকার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী, বেবিচক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমানসহ অনেক ভিআইপিদের সঙ্গে ছবি রয়েছে বোতল চৌধুরীর। তার বাংলাদেশ ও কানাডার আলাদা দুটি পাসপোর্ট রয়েছে।
জনপ্রিয়
আইন আদালত থেকে আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে নির্বাচনী সহিংসতায় এক দশকে ১১ খুন, একটিরও বিচার হয়নি
চট্টগ্রামে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত এক দশকে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার একটিরও বিচার এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। এতে হতাশ নিহতদের পরিবার ও বিচারপ্রার্থীরা।
.jpg)
সাগর–রুনি হত্যার ১৪ বছর: অন্তর্বর্তী সরকার কোনো কাজই করেনি
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। আজ সেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এই সময়ে সরকার বদলেছে, তদন্ত সংস্থা বদলেছে, কিন্তু মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে সাগর-রুনিকে
.jpg)
হিরো আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি
বিয়ের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও গর্ভপাত করানোর অভিযোগে আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–২–এর বিচারক
.jpg)
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুলের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া এবং মোট সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
.jpg)
.jpg)
.jpg)


.webp)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)