যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং পরোক্ষভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে আনতে পারে তবে তা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি পরিবর্তন ডেকে আনবে। ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন লাতিন আমেরিকান সংকট নয়; বরং এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির শক্তিরেখা নতুন করে আঁকার একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত বার্তা।
এই পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র যে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা মানবাধিকার রক্ষার বয়ান হাজির করছে তা বাস্তবে একটি রাজনৈতিক মুখোশ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হলো জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল, বৈশ্বিক বাণিজ্য পথের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জোটগুলোর শক্তির ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে পুনর্গঠন করা। এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের নিকট ভেনেজুয়েলা একটি কৌশলগত সম্পদ।
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পারস্য উপসাগরভিত্তিক জ্বালানি ঝুঁকির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ইরান ইস্যুতে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান খুব দ্রুতই ওয়াশিংটনের শীর্ষ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। কারণ ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সংঘাতে যদি হরমুজ প্রণালি বা উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিকল্প ও তুলনামূলক নিরাপদ বাফার হিসেবে কাজ করবে।
Related posts here
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যদি নির্ভরযোগ্য ভারী ক্রুড তেলের উৎস থাকে তবে পারস্য উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলেও বৈশ্বিক বাজারে তার ধাক্কা অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। এতে করে বিস্তৃত সামরিক সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত থাকবে এবং ইরানের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও সহজ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে এই নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক তেল প্রবাহ ও দামের ওপর আরও শক্তভাবে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দেবে। জ্বালানি বাজারে ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা আরও দৃঢ় হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে পরিচিত পেট্রোডলার ব্যবস্থাও নতুন করে সুরক্ষিত থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা কোনো সাধারণ আঞ্চলিক ইস্যু নয়। এটি একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত। যার মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক প্রকৌশল এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর কাঠামো বদলে দিয়ে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন করা সম্ভব। এটি এক ধরনের 'মডেল' হিসেবে কাজ করছে। যার ফলে ভবিষ্যতে অন্যান্য সম্পদসমৃদ্ধ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি অশনিসংকেত।
তবে এই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে যেতে পারে যদি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। একটি দীর্ঘ, সংকটপূর্ণ ও ব্যয়বহুল সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করবে। সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ নিঃশেষ করবে এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা দুর্বল করে দেবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাবেও, কারণ দেশটির নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভরশীল।
- লেখক: রাকিবুল হাসান মুন্না, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর