মতামত
জাতি গঠন: ইতিহাস, পরিচয় ও রাষ্ট্রের ভিত
.jpg)
ছবি: সংগৃহীত
জাতি গঠন (Nation Building) কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া প্রক্রিয়া নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সম্মিলিত চেতনার দীর্ঘ পথচলার ফল। একটি জনগোষ্ঠী কখন নিজেকে “আমরা” হিসেবে চিনতে শেখে এবং সেই পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় সেখানেই জাতি গঠনের মূল সাফল্য নিহিত।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জাতি গঠন কখনো স্বতঃস্ফূর্ত নয়, বরং এটি সচেতন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার ফল। ইউরোপে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা বিকশিত হয় মূলত ওয়েস্টফালিয়া চুক্তি (১৬৪৮) পরবর্তী সময়ে। ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব জাতি গঠনের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। বিপ্লবের আগে ফরাসি জনগণ ছিল মূলত রাজা ও ভূখণ্ডকেন্দ্রিক; বিপ্লবের পর ভাষা, নাগরিকত্ব ও সমতার ধারণার মাধ্যমে “ফরাসি জাতি” একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ নেয়।
অন্যদিকে, জার্মান জাতি গঠনের পথ ছিল ভিন্ন। উনিশ শতকের আগে জার্মানি ছিল বহু ক্ষুদ্র রাজ্য ও প্রিন্সিপ্যালিটির সমষ্টি। ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য থাকলেও রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। বিসমার্কের নেতৃত্বে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জার্মান জাতি গঠন সম্পন্ন হয়। এই উদাহরণ দেখায়, কখনো সংস্কৃতি আগে আসে, কখনো রাষ্ট্র তবে জাতি গঠন সবসময়ই বহুমাত্রিক।
উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতি গঠনের অভিজ্ঞতা আরও জটিল। ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য উপেক্ষা করে কেবল ধর্মকে জাতির ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো টেকসই হয়নি। এর ফলই ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়া একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এখানে ভাষা ছিল জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা রাজনৈতিক রূপ পেতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সেই জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, ভাষা ও সংস্কৃতি জাতি গঠনের ক্ষেত্রে কতটা শক্তিশালী উপাদান হতে পারে।
তবে জাতি গঠন কেবল স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতার পর জাতি গঠন আরও কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমতা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ নিশ্চিত না হলে জাতি গঠন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আফ্রিকার অনেক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিভাজনের কারণে শক্তিশালী জাতি গঠন করতে পারেনি নাইজেরিয়া বা সুদানের উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতি গঠনের চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জাতি গঠনের অপরিহার্য শর্ত। জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক নিজেকে সমান মর্যাদার অংশ মনে করে।
জাতি গঠন কোনো একক মুহূর্তের ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইতিহাস, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় নীতির সম্মিলনে জাতি গড়ে ওঠে। যে জাতি তার বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপ দিতে পারে, সেই জাতিই দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়জাতি গঠনের ভিত্তি যদি জনগণের বাস্তব পরিচয় ও চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা ইতিহাসের গতিপথও বদলে দিতে পারে।
- বি. এম. হাসান মাহমুদ, লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
জনপ্রিয়
মতামত থেকে আরও পড়ুন
রিয়েল এস্টেট সেক্টরে প্রয়োজন পর্যাপ্ত আধুনিকায়ন
বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এই খাত প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেন হয়েছিল?
মাত্র দেড় বছর আগে সংঘটিত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তাক্ত আন্দোলন- যাকে অনেকেই ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দেন তা ঘিরে জনমনে নানা আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও এর পেছনের কারণগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন
সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর
মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।


.jpg)






