মতামত
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন: নিরপেক্ষতার পরীক্ষা এখনই

ছবি: দূরবিন নিউজ
বাংলাদেশ এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রশ্ন একটাই এবার কি নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে, নাকি আগের মতোই নির্বাচন একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক অনুশীলনে সীমাবদ্ধ থাকবে?
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আইন অনুযায়ী কমিশনের হাতে রয়েছে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, আচরণবিধি প্রয়োগ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার পূর্ণ ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতা থাকা আর ক্ষমতা প্রয়োগ করা এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যই বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট। ভারতের সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচন (২০২৪) এই ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটিতে ক্ষমতাসীন দলই হোক বা বিরোধী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও সতর্ক করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট ভারতের নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর কর্তৃত্ব হারায়নি। বাংলাদেশে এয়োদশ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে এমন কর্তৃত্ব দৃশ্যমান কি না সে প্রশ্ন এখনও অনুত্তরিত।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা যদি না থাকে, তবে সবচেয়ে নিখুঁত নির্বাচন ব্যবস্থাও অর্থহীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের চাপে রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক ভূমিকা এখানে তুলনামূলক উদাহরণ হতে পারে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে শাসক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কারণ কমিশন আগেই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, ভোটই চূড়ান্ত। বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন যদি আগাম এমন বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বিতর্ক অনিবার্য হবে।
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাস্তবে কার নির্দেশ মানবে? ইন্দোনেশিয়ার ২০২৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন (KPU) সরাসরি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি, শাস্তি ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অমান্য করার নজির সেখানে বিরল। বাংলাদেশে কমিশনের নির্দেশনা অনেক সময় মাঠপর্যায়ে উপেক্ষিত হয় এমন অভিযোগ নতুন নয়। কমিশন যদি এই বাস্তবতা মোকাবিলা করতে না পারে, তবে ‘নিরপেক্ষ প্রশাসন’ কথাটি কেবল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংসদীয় শুনানি ও বহুদলীয় মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক। ফলে কমিশন শুরু থেকেই একটি নৈতিক শক্তি নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে আইন থাকলেও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক আস্থার সংকট দূর করতে পারেনি। এয়োদশ নির্বাচনে এই সংকট কাটাতে না পারলে কমিশনের ওপর ‘পক্ষপাতের’ অভিযোগ আবারও ঘনীভূত হবে।
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য আরেকটি নিয়মিত দায়িত্ব নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কমিশন চাইলে এই নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি বাঁকবদলের উদাহরণ বানাতে পারে, আবার চাইলে এটিকে আগের বিতর্কগুলোর ধারাবাহিকতায় ঠেলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রশ্নটি খুব পরিষ্কার তারা কি ক্ষমতার সুবিধাজনক নীরবতার পাশে থাকবে, নাকি সংবিধান ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসে কী নামে স্মরণীয় হবে।
- বি. এম. হাসান মাহমুদ, লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
মতামত থেকে আরও পড়ুন
‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?
‘বট’ আইডির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নেটিজেনরাই জানেন, এবং ‘বট’ বলে ট্যাগ করেন, কিন্তু এর বাইরের কারণগুলো নিয়েই আলোচনা বেশি জরুরি এখন। আসলে এখানে জড়িত আরও বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।
.jpg)
জেন-জির অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনে ফিরছে কি পুরোনো রাজনীতি
জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের দাবি, চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই জেন–জির নেতৃত্বেই সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম আশা করেছিল রাজনীতিতে মৌলি
.jpg)
ক্ষমতার ভারসাম্যনীতিঃ বাংলাদেশে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের অসাম্য অবস্থান
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি। মন্টেস্কিয়ুর তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিন্তু একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে রাখবে। এই নীতির উদ্দেশ্য
.jpg)

.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)