ইতালীর সিসিলিতে রয়েছে এমন একটি মমি, যা মৃত্যুর ১০০ বছর পরেও এখনো মাঝে মধ্যে চোখ খুলে আগত দর্শনার্থীদের দেখে। আবার কিছুক্ষণ পর চোখ বন্ধ করে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
২ বছর বয়সী ফুটফুটে একটি শিশুর মমি এটি।
একসময়, মিশরের মতোই ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও মৃত মানুষকে মমি করে রাখার প্রচলন ছিল।
যার মধ্যে ইতালী অন্যতম। দেশটির সিসিলিতে রয়েছে বিশাল আয়তনের ভূগর্ভস্থ সমাধিক্ষেত্র।
যেখানে থরে থরে সাজানো আছে বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ এবং শিশুদের ১২৮৪ টি মমি।
যার মধ্যে রয়েছে ২ বছর বয়সী ওই শিশুটির মমিও। যা দেখতে অনেকটা ব্যাটারীচালিত পুতুলের মতো।
মমিকৃত শিশুটির নাম রোজালিয়া লম্বার্ডো।
আজ থেকে ১০২ বছর পূর্বে, ১৯২০ সালে মারা যায় সে।
সোনালী চুলের রোজালিয়া আর এক সপ্তাহ বেচে থাকলেই ২ বছর বয়স পূর্ণ করত।
মেয়েকে হারিয়ে বাবা-মা তখন শোকে পাগলপ্রায়।
এর ৩ বছর আগে নিজেদের আরেক পুত্রসন্তান কে হারিয়েছিলেন তারা। অসময়ে পরম আদরের কন্যাকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত ছিলেন না রোজালিয়ার বাবা মারিও।
সেসময় ইতালীতে প্রিয়জনদের মৃতদেহ মমি করে রাখার জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু, এর জন্য প্রচুর পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হতো।
রোজালিয়ার বাবা সিদ্ধান্ত নেন, যে করেই হোক মেয়েকে মমি করে আজীবন চোখের সামনে রেখে দিবেন তিনি।
যার জন্য সারাজীবনের তিল তিল করে গড়ে তোলা সকল সঞ্চয় ব্যয় করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন মারিও।
রোজালিয়ার মমিটি তৈরী করেছেন বিখ্যাত দেহ সংরক্ষক আলফ্রেডো সালাফিয়ার। মেয়ের মমি তৈরীর জন্য মোটা পারিশ্রমিক দিয়ে তাকে নিয়োগ দেন রোজালিয়ার বাবা।
আলফ্রেডো তার দক্ষতা এবং জ্ঞান কাজে লাগিয়ে রোজালিয়ার মমিকে একপ্রকার জীবন্ত করে তোলেন।
আলফ্রেডোর হাতের জাদুতে প্রাণ ফিরে আসে রোজালিয়ার চোখে। কখনো শিশুটি চোখ বন্ধ করছে আবার কখনো খুলছে। যা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রোজালিয়ার বাবা মারিও।
কিন্তু,রোজালিয়ার বাবার কাছ থেকে এক টাকাও পারিশ্রমিক হিসেবে নেননি আলফ্রেডো।
অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া নিষ্পাপ শিশুটির প্রতি অকৃত্রিম মায়া থেকেই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন তিনি।
আলফ্রেডো কিভাবে এই কাজ করেছিলেন সেই রহস্য ভেদ করেছিলেন ইতালির জৈবিক নৃবিজ্ঞানী দারিও পিওম্বিনো মাস্কালী।
এই রহস্যের জট খুলতে ৯০ বছর সময় লেগেছিল। মাস্কালী জানান, রোজালিয়ার চোখের পাতা সত্যি সত্যি খোলা বা বন্ধ হচ্ছেনা।
বরং, অপটিকাল ইল্যুশন এর মাধ্যমে তা দেখানো হচ্ছে।
অর্থ্যাৎ, মানুষের চোখকে ফাকি দিয়ে; এমন একটি জিনিস তুলে ধরা হয়েছে যা সত্যি নয়।
আসলে, মমি করার সময় ইচ্ছে করে শিশুটির চোখ অর্ধেক খোলা রেখেছিলেন আলফ্রেডো।
তার উপরে ইথার এবং প্যারাফিনের প্রলেপ দেন তিনি। এই দুটি উপাদান একত্রে লেন্সের মতো কাজ করে থাকে।
ফলে, রোজালিয়ার চোখের পাতায় বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন কোণে আলো পড়লে একেক রকম দৃশ্য তৈরী হয়। যার কারণে একেক পাশ থেকে দেখলে চোখ গুলোকে একেক রকম মনে হয়।
সম্প্রতি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মমিটির দেহ পচে যেতে শুরু করে। তাই আগের জায়গা থেকে সরিয়ে একে সমাধিক্ষেত্রের সবচাইতে শীতল স্থানে নিয়ে আসা হয়েছে।
সেখানে একটি কাচের পাত্রে নাইট্রোজেন ভরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে শিশুটিকে। এখানে আগত পর্যটকদের কাছে এক বিস্ময়কর এবং কৌতুহল জাগানো বস্তু এই মমি।
রোজালিয়ার গাঢ় সোনালী চুল সোনালী ফিতে দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর মমি হিসবে স্বীকৃত এটি। যার কারণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে একে সংরক্ষণ করা হয়।