প্রায় ৬০ বছর পর সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতি পৃথিবীর খুব কাছাকাছি এসেছে। সম্প্রতি এরকম তথ্য নিশ্চিত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
এই ঘটনার ফলে পৃথিবী থেকে বৃহস্পতিকে অনেক স্পষ্ট এবং উজ্জ্বল দেখায়। গত ৬০ বছরের ইতিহাসে এটি একটি মহাজাগতিক বিরল ঘটনা।
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা জানান, গত ২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিকে সারা রাতই আকাশে দেখা গেছে। সূর্য এবং বৃহস্পতি পৃথিবীর বিপরীতে একই দিকে অবস্থান করেছিল।
এতে করে সূর্যের মতোই পৃথিবীর নিয়ম অনুসারে বৃহস্পতিও পূর্ব দিকে ওঠেছে এবং পশ্চিমে অস্ত গিয়েছে। সেদিন ২০১৭ সালের তুলনায় বৃহস্পতিকে এগার গুণ বড় ও দেড়গুণ উজ্জ্বল দেখা গেছে।
নাসার দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে , সেদিন চাঁদ ছাড়া আকাশের অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে বৃহস্পতিকেই সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখা গেছে।
কিন্তু খালি চোখে পৃথিবী থেকে কেউ বৃহস্পতিকে দেখতে পারেনি। এই গ্রহটি বিশেষ টেলিস্কোপের মাধ্যমে দেখা হয়। সেদিন পৃথিবী ও বৃহস্পতির মধ্যে দূরত্ব কমে ৫৮ কোটি কিলোমিটারে নেমে আসে।
পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব প্রায় ৫৯২.৬৯ মিলিয়ন কিলোমিটার। কিন্তু ঐদিন পৃথিবী থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব ছিল ৩৬৫ মিলিয়ন কিলোমিটার। যা গত ষাট বছরে সবচেয়ে কম।
সাধারণত প্রতি ১৩ মাস পর পৃথিবীর ঠিক বিপরীত অবস্থানে চলে আসে বৃহস্পতি। অর্থাৎ পশ্চিম দিকে সূর্যাস্ত হয় আর পূর্বে থাকে বৃহস্পতি। ফলে অগাস্টে মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরে গ্রহটিকে বড় দেখায়।
এক মাত্র পৃথিবী এবং বৃহস্পতিই বৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে না। ফলে বছর জুড়ে তাদের মধ্যে দূরত্বের তারতম্য ঘটে প্রায় সময়েই। এ বার একই সঙ্গে পৃথিবীর কাছাকাছি চলে এসেছে বৃহস্পতি। যা মহাকাশ প্রেমীদের কাছে দারুণ একটি ব্যাপার।
এদিকে বৃহস্পতির এ রকম পৃথিবীর কাছাকাছি আসার ঘটনাটি মহাজাগতিক বলে জানিয়েছেন নাসার মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গবেষণারত জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডাম কোবেলস্কি।
২০২২ সালের আগে ১৯৬৩ সালে সর্বশেষ পৃথিবী থেকে বৃহস্পতিকে এত কাছে দেখা গিয়েছিলো। আয়তনে এটি সবচেয়ে বড় গ্রহ এবং দূরত্বের দিক দিয়ে পঞ্চম।
গ্রহটির ব্যাস ১ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। এটি আয়তনে পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ গুণ বড়। সূর্য থেকে বৃহস্পতির দূরত্ব প্রায় ৭৭.৮ কোটি কিলোমিটার। এই গ্রহের প্রাথমিক উপাদান হচ্ছে হাইড্রোজেন এবং সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম।
তবে বিজ্ঞানীদের ধারনা সেখানে ভারী মৌল সমূহ দিয়ে গঠিত একটি কেন্দ্রও থাকতে পারে। গ্রহটি খুব দ্রুত ঘুরে। আর এই কারণে এর আকৃতি গোলকের মতো।
এছাড়া বিষুব অঞ্চলের কাছে ক্ষুদ্র একটি স্ফীতি অংশ রয়েছে। এটি সহজেই চোখে পড়ে। এর বাইরের বায়ুমণ্ডল বিভিন্ন অক্ষাংশে বিভিন্ন ব্যান্ডে বিভক্ত।
এ কারণে একটি ব্যান্ডের সাথে অন্য আরেকটি ব্যান্ডের সংযোগস্থলে ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে। এর ফলে সেখানে একটি মহা লাল বিন্দু তৈরি হয়েছে। এই লাল বিন্দুকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রচুর কৌতুহল রয়েছে।
এটি আসলে একটি অতি শক্তিশালী ঝড়। যা সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা সেখানে বয়ে চলেছে বলে ধারণা করা হয়।
২০২১ সালের হিসাব মতে বৃহস্পতির উপগ্রহের সংখ্যা ৮০ টি। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে আরো নতুন উপগ্রহের খোঁজ ও মিলতে পারে।
বর্তমানে নাসা-র জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে ছয় বছর ধরে। এটি বৃহস্পতির ভূপৃষ্ঠ, উপগ্রহ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে।
গ্রহটির উপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আগামী দিনে সৌরজগতের গঠন নিয়ে উল্লেখোগ্য অবিষ্কার উঠে আসতে পারে বলে আশা করেন বিজ্ঞানীরা।