শিক্ষা


ঢাকার অলিগলিতে নামে-বেনামে স্কুল, দেখেও না দেখার ভান সরকারের


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার

ঢাকার অলিগলিতে নামে-বেনামে স্কুল, দেখেও না দেখার ভান সরকারের

ছবি: দূরবিন নিউজ


ঢাকার অলিগলি ধরে হাঁটলেই চোখে পড়ে অসংখ্য রঙিন সাইনবোর্ড কোথাও ‘প্রি-প্রাইমারি’, কোথাও ‘কেজি স্কুল’, কোথাও ‘ইংলিশ মিডিয়াম’ বা ‘মডেল একাডেমি’। বাইরে থেকে দেখলে সবই স্কুল। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে উঠে আসে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। সরু গলি, আবাসিক ভবনের নিচতলা, ভাড়া করা ফ্ল্যাট কিংবা অস্থায়ী কয়েকটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসানো হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের। নেই খোলা ক্লাসরুম, নেই খেলার জায়গা, নেই অগ্নিনিরাপত্তা বা জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা। অথচ এসব দেখেও যেন দেখার কেউ নেই।

 

রাজধানীজুড়ে প্রাথমিক পর্যায়ের শত-শত স্কুল নামে-বেনামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগ, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা সবকিছুই প্রশ্নের মুখে। সবচেয়ে বড় কথা, এসব স্কুল কার অনুমতিতে চলছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর আদৌ জানে কি না সে প্রশ্নের কোনো পরিষ্কার উত্তর নেই।

 

এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে সম্প্রতি নয়াপল্টনের শারমিন একাডেমির ঘটনায়। একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের অফিস কক্ষে চার বছর বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে মারধর করছেন এক ব্যক্তি, পাশে বসে থাকা এক নারী শিশুটির হাত চেপে ধরে রাখছেন। পরে জানা যায়, নির্যাতনকারী ব্যক্তি স্কুলটির ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার এবং পাশে থাকা নারী প্রধান শিক্ষক শারমিন আক্তার। দুজনই প্রতিষ্ঠানটির মালিক।

 

ঘটনার তিন দিন পর পবিত্র কুমারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পর থেকেই স্কুলটিতে তালা ঝুলছে। ২২ জানুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুলের ভেতরে কোনো কার্যক্রম নেই। দেয়ালে টাঙানো ফোন নম্বরগুলো বন্ধ। স্কুল ভবনের কেয়ারটেকার কামরুল হক জানান, হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে, কেন বন্ধ তিনি নিজেও জানেন না।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভবনের ভেতরেই একটি বিউটি পার্লারসহ আরও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্কুলটি অনুমোদিত কি না, সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদ এসব নিয়ে কেউ কখনো খোঁজ নেয়নি।

 

শারমিন একাডেমি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানীর আজিমপুর, পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলির ভেতরে এ ধরনের অসংখ্য স্কুল-মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ফ্ল্যাটে ৩০ থেকে ৪০ জন শিশুকে গাদাগাদি করে বসানো হচ্ছে। তবুও বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে চলছে।

 

Related posts here

 

আইন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০১১ সালে হাইকোর্ট একে অসাংবিধানিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে ঘোষণা দেন। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ।

 

তবুও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২১ সালে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ২১টি ঘটনা রেকর্ড হয়। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯-এ। ২০২৩ সালে ৪৭ এবং ২০২৪ সালে ৩০টি ঘটনায় নেমে এলেও ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়—এক বছরে ৫৯টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

 

এ অবস্থায় অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানীর মিরপুরের অভিভাবক নাঈমা মিতু বলেন, কাজের চাপে বাধ্য হয়ে কাছের স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাই। কিন্তু ভেতরে কী হচ্ছে, জানার কোনো উপায় নেই। শারমিন একাডেমির ভিডিও দেখে আমি আতঙ্কিত।

 

আরেক অভিভাবক শারমিন সুলতানা বলেন, লটারিভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থার কারণে আমাদের মতো পরিবারগুলো গলির ভেতরের স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অনুমোদন নেই, প্রশিক্ষণ নেই তারপরও এসব স্কুল চলছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সংকট তদারকির অভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কোথায় কতগুলো প্রি-প্রাইমারি বা প্রাথমিক স্কুল প্রয়োজন সে পরিকল্পনাই নেই।

 

তিনি বলেন, অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ট্রাস্ট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত। ফলে শিক্ষক নিয়োগ, শিশু সুরক্ষা বা আচরণবিধির কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই সুযোগেই শিশুনির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে।

 

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, কোনো শিশুকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতনের অধিকার কারও নেই। এটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। তিনি জানান, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধনের জন্য বিধিমালা রয়েছে এবং তা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে একটি সফটওয়্যার চালুর কথাও জানান তিনি।

 

তবে সরাসরি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব মূলত মন্ত্রণালয়ের বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 

রাজধানীর অলিগলিতে এভাবে অনিরাপদ স্কুল চলতে থাকা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি শিশুদের জীবনের সঙ্গে সরাসরি ঝুঁকির বিষয়। নিবন্ধন, নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই অরাজকতা থামবে না এ কথা এখন স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, আর কত ঘটনার পর রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে চোখ খুলবে?


সম্পর্কিত

স্কুলসাইনবোর্ডকেজি স্কুলইংলিশ মিডিয়াম

জনপ্রিয়


শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন

সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০ দিনের মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই নিশ্চিতের নির্দেশ ইউজিসির

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছে।

বার কাউন্সিল পরীক্ষায় সাফল্য: নজরুল, কুবি ও মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫৯ শিক্ষার্থী আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির মোট ১৫৯ জন শিক্ষার্থী আইন পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ সাফল্য আনন্দের সৃষ্টি করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ পেলেন অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আউয়ালকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ছুটির তালিকা থেকে শুক্র–শনিবার বাদ দেওয়ার দাবি

পবিত্র রমজান মাসে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পূর্বের মতো পূর্ণ ছুটি বহাল রাখা এবং সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারকে বার্ষিক ছুটির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। নতুন করে ছুটির তালিকা বাস্তবসম্মতভাবে সমন্বয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।