জাতীয়


কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাই পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য: পররাষ্ট্রমন্ত্রী


নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১৭ জুন ২০২৬, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার

কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাই পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

 

বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনের বৈঠকে নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। এদিন প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

 

লিখিত প্রশ্নে রফিকুল ইসলাম হিলালী জানতে চান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও বহুমুখীকরণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী।

 

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিবাসন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কোনো একক অঞ্চল বা শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত বাস্তববাদী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।

 

ড. খলিলুর রহমান বলেন, অতীতে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার নজির রয়েছে। বর্তমান সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট। পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি।

 

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ন্যায্যতা, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাসহ বিদ্যমান অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে বাংলাদেশ।

 

আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরায় কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে বিমসটেককে আরও গতিশীল করতে কাজ করা হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণে কার্যকর নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতাকে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল সংযোগ এবং ব্লু ইকোনমির মতো নতুন খাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকাকে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও পণ্যের একটি ম্যাপিং কার্যক্রম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনা করছে।

 

জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণকেও বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক হলেও পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

লিখিত জবাবের শেষাংশে ড. খলিলুর রহমান বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ একটি আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী এবং ফলপ্রসূ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, সক্রিয় অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কার্যকর বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার মর্যাদা ও প্রভাব আরও সুদৃঢ় করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে।

 

 

 


সম্পর্কিত

পররাষ্ট্রমন্ত্রী

জনপ্রিয়


জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ফি কমানোর প্রস্তাব পর্যালোচনায় সরকার

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট ফি কমানোর একটি প্রস্তাব সরকার পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্টসেবা আরও সহজ, দ্রুত ও সহজলভ্য করতে একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

৫ বছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীতের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় সংসদে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা, রাজস্ব প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং কর ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।

প্রান্তিক কৃষককে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ: প্রধানমন্ত্রী

দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং কৃষিখাতকে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

বিয়ে নিবন্ধনে ডিজিটাল জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বিয়ের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কাগজের জন্মসনদের পরিবর্তে অনলাইন বা ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন রেকর্ড বাধ্যতামূলক করতে ‘বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন আইনের খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন।